Sunday, October 5, 2025
কবিতা শারদ অর্ঘ্য
Monday, September 29, 2025
উৎসবের মেজাজ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা
উৎসবের মেজাজ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা
উৎসবের মেজাজ
Saturday, September 27, 2025
বিবর্ণ শরৎ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা
বিবর্ণ শরৎ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা
বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হলো শারদীয় দুর্গা পূজা। এ সময় শরতের আকাশ ভরে ওঠে শিউলির সুগন্ধে, ঢাকের বাজনায় মুখরিত হয় প্রতিটি পূজামণ্ডপ। সেই আনন্দঘন উৎসবের আবহকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে কবিতা “বিবর্ণ শরৎ”।
এই কবিতায় যেমন রয়েছে দুর্গোৎসবের আনন্দ, তেমনি রয়েছে বিদায়ের বেদনা। কারণ দেবী দুর্গার আগমন মানেই উৎসব, আর বিদায় মানেই বিষণ্নতা। শরতের সাদা মেঘ আর শিউলি ফুলের সুবাসে ভরা সময়ে, কবিতাটি পাঠকের মনে ছুঁয়ে যায় গভীর আবেগ।
বিবর্ণ শরৎ
-শুভ জিত দত্ত
শরৎ এর সকাল উঠান জুড়ে ছড়িয়ে থাকা
শিউলি ফুলের একরাশ স্নিগ্ধতা
দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলেই দিগন্ত জোড়া
কাশফুলের রাজ্যে জুড়ে ঢেউ খেলে।
নীল আকাশে সাদা মেঘের দল ভীর জমিয়ে
এক অদ্ভুত আলপনা এঁকে যাই
সন্ধ্যার আগ মুহুর্ত অবধি চলে তাদের এই
আঁকিবুঁকি খেলায় মেতে থাকা।
এবছর যেন তার ঠিক ব্যতিক্রম শরৎ আকাশে
সাদা মেঘ ম্লান হয়েছে কালো মেঘে।
সময়ে অসময়ে ঘনিয়ে আসে কালো মেঘ আর
অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে যায় ।
শরৎ এর সেই চিরচেনা আমেজ ফিকে
হয়েছে মেঘ বৃষ্টির দখলে গিয়ে।
আবার নীলাভ শুভ্র আকাশের বুকে ভীর
জমাক স্নিগ্ধ সাদা মেঘের দল।।
Saturday, August 23, 2025
Google I/O 2025: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত
Google I/O 2025: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত
প্রতিবারের মতো এ বছরও Google I/O সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য হাজির হয়েছে যুগান্তকারী সব ঘোষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গুগল তাদের সেবাকে আরও উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত ফিচারগুলো—
Google Meet: ভাষা পেরিয়ে কথা বলার নতুন অভিজ্ঞতা
এখন থেকে অনলাইনে মিটিং করার সময় ভাষার বাধা আর থাকছে না। Google Meet–এ যুক্ত হয়েছে রিয়েল-টাইম ট্রান্সলেশন ফিচার, যেখানে একজন বাংলা ভাষায় কথা বললে অপর প্রান্তের মানুষ ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষায় শুনতে পাবেন। শুধু অনুবাদ নয়, বরং বক্তার স্বর ও টোনও সংরক্ষিত থাকবে। ফলে যোগাযোগ হবে আরও স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত।
Veo 3: সিনেমার মতো ভিডিও বানাবে AI
গুগল উন্মোচন করেছে Veo 3, তাদের সর্বশেষ ভিডিও জেনারেশন মডেল। এটি শুধু টেক্সট থেকে ভিডিও তৈরি করে না, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাউন্ড, ইফেক্ট, এমনকি ডায়লগও জেনারেট করতে পারে। ব্যবহারকারীরা একটি ছবি দিয়েই ছোট ভিডিও বানাতে পারবেন। এক কথায়, সিনেমা নির্মাণের জটিল কাজ এখন অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
Google AI Ultra: প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান
উন্নত সুবিধা পেতে চাইলে ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে Google AI Ultra সাবস্ক্রিপশন। মাসিক নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এটি ব্যবহার করে পাওয়া যাবে Veo 3, Flow, Deep Think মডেলসহ নানা প্রিমিয়াম ফিচার। সিনেমার VFX, ভিডিও, সাউন্ড—সবকিছু তৈরি করার ক্ষমতা এই প্ল্যানে উন্মুক্ত।
Gemini স্মার্ট চশমা: বাস্তবেই ভবিষ্যতের পথে
সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘোষণার একটি হলো Gemini Smart Glasses (Android XR)। এই স্মার্ট চশমার মাধ্যমে—
-
নোটিফিকেশন পড়া ও শোনানো
-
রিয়েল-টাইম অনুবাদ
-
নেভিগেশন গাইড
-
আশপাশের তথ্য জানার সুবিধা
সবই পাওয়া যাবে। সহজভাবে বললে, এটি যেন চোখের সামনে আরেকটি Google Assistant!
Deep Think: জটিল প্রশ্নের সমাধান
গুগল তাদের নতুন AI মডেল Deep Think ঘোষণা করেছে, যা Ultra সাবস্ক্রিপশনের অংশ।
-
এটি ধাপে ধাপে চিন্তা করে জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।
-
শিক্ষা, গবেষণা বা ব্যবসায়িক বিশ্লেষণে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
Google I/O 2025 দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিচ্ছে। যোগাযোগ থেকে শুরু করে সিনেমা নির্মাণ কিংবা ভ্রমণের পথে সহায়ক তথ্য পাওয়া—সবকিছুই এখন আরও সহজ, দ্রুত ও আকর্ষণীয়। প্রযুক্তি যে ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, Google-এর এই ঘোষণাগুলোই তার প্রমাণ।
Thursday, August 7, 2025
রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
১৮৮৩ সালের ২রা মে, চৈত্র কৃষ্ণাদশমী তিথিতে সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—দুই মহান আত্মার, শ্রীমৎ রামকৃষ্ণদেব ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র সাক্ষাৎ। স্থান ছিল উত্তর কলকাতার প্রফুল্ল স্ট্রিটের ২৩৪ নম্বর বাড়ি, যেটি ‘নন্দনবাগান’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে ব্রাহ্মসমাজের বিংশ সাংবাৎসরিক উৎসব উদযাপন চলছিল। এই উপলক্ষে ঠাকুর উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁর ভক্তদের—বিশেষত রাখাল মহারাজ (পরবর্তীতে স্বামী ব্রহ্মানন্দ)—সহ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল পাঁচটা নাগাদ কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ির সবচেয়ে বড় কক্ষে আয়োজিত হয় এক বিশেষ সভা। সভা শুরু হয় এক অনন্য শিল্পানুষ্ঠানে—ঠাকুর রামকৃষ্ণের অনুরোধে যুবক রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো বাজিয়ে পরিবেশন করেন নিজের লেখা ব্রহ্মসংগীত “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তরে।” এই গানটি যেন শুধু রামকৃষ্ণদেবের জন্যই লেখা হয়েছিল—তেমনই এক আত্মিক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।
গানটির ভেতরে ছিল গভীর আত্মসমর্পণের আহ্বান, যা শুনে শ্রীমৎ ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন—চোখে জল, হৃদয়ে ভক্তির উথান। আর সেই দৃশ্য দেখে ২২ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথও বিমুগ্ধ হয়ে যান। দুই মহান ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোনো কথোপকথনের দীর্ঘ বিবরণ নেই, কিন্তু তাঁদের ভেতরকার অনুভব ও মানসিক যোগাযোগ ছিল অনির্বচনীয়।
সভা শেষে ঠাকুর সকলের সঙ্গে বসে লুচি, ডাল, তরকারি ও মিষ্টি খান এবং আনন্দঘন পরিবেশে বিদায় জানিয়ে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যান।
এই একটি মাত্র সাক্ষাৎ যদিও সংক্ষিপ্ত ছিল, তবে তা দুই মহামানবের অন্তর্জগতের মিলনের এক অনন্য স্মারক হয়ে আছে ইতিহাসে। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও সুসম্পর্ক ছিল। ব্রাহ্মসমাজ ও রামকৃষ্ণ পরম্পরার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধ, এই সাক্ষাৎ যেন তারই এক শুভ চিহ্ন।
Saturday, July 26, 2025
গুগল জেমিনি: ভবিষ্যৎ আনছে নতুন দিগন্ত!
গুগল জেমিনি: ভবিষ্যৎ আনছে নতুন দিগন্ত!
গুগল জেমিনি (Google Gemini) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক নতুন বিপ্লব আনতে চলেছে, যা আমাদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। গুগল তার এই অত্যাধুনিক এআই মডেলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের জন্য কী কী অসাধারণ সুবিধা নিয়ে আসছে, সে সম্পর্কে একটি বিস্তারিত ধারণা নিচে দেওয়া হলো।
১. উন্নত কথোপকথন এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ (NLP)
জেমিনি শুধুমাত্র একটি চ্যাটবট নয়; এটি আপনার সাথে আরও স্বাভাবিক এবং অর্থপূর্ণ কথোপকথন করতে সক্ষম। এটি মানুষের ভাষার সূক্ষ্মতা, আবেগ এবং প্রসঙ্গ বুঝতে পারে, যার ফলে এটি আরও প্রাসঙ্গিক এবং সহায়ক উত্তর দিতে পারে। ভবিষ্যতে এটি আরও জটিল আলোচনা পরিচালনা করতে পারবে, এমনকি আপনার মেজাজ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেবে।
২. মাল্টিমোডাল ক্ষমতা: টেক্সট, ছবি এবং আরও অনেক কিছু!
জেমিনির অন্যতম শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য হলো এর মাল্টিমোডাল ক্ষমতা। এর মানে হলো এটি শুধুমাত্র টেক্সট নয়, ছবি, অডিও এবং ভিডিও ডেটা বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:
আপনি একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারবেন, "এই ছবিতে কী আছে?" এবং জেমিনি বিস্তারিত বর্ণনা দেবে।
একটি ভিডিওর নির্দিষ্ট অংশ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সেটি বিশ্লেষণ করে উত্তর দিতে পারবে।
বিভিন্ন ডেটা ফরম্যাট একত্রিত করে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
৩. কোডিং এবং ডেভেলপমেন্টে সহায়তা
প্রোগ্রামারদের জন্য জেমিনি একটি অসাধারণ টুল হতে চলেছে। এটি কোড লিখতে, ডিবাগ করতে এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষার মধ্যে অনুবাদ করতে সাহায্য করবে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের প্রক্রিয়াকে এটি আরও দ্রুত এবং ত্রুটিমুক্ত করবে। ডেভেলপাররা নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে বা বিদ্যমান কোডবেস উন্নত করতে জেমিনির সাহায্য নিতে পারবেন।
৪. শিক্ষা এবং গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
শিক্ষার্থীরা এবং গবেষকরা জেমিনির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং জটিল বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারবেন। এটি ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা পাবে। গবেষণা কাজে এটি ডেটা বিশ্লেষণ, হাইপোথিসিস তৈরি এবং প্রবন্ধ লেখায় সহায়তা করবে।
৫. দৈনন্দিন কাজকর্মে স্মার্ট সহায়তা
আপনার দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ করতে জেমিনি বিভিন্নভাবে সাহায্য করবে:
সময়সূচী ব্যবস্থাপনা: আপনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মিটিং সেট করা বা রিমাইন্ডার দেওয়া।
ভ্রমণ পরিকল্পনা: ফ্লাইট, হোটেল এবং কার্যক্রমের পরিকল্পনা তৈরি করা।
তথ্য অনুসন্ধান: যেকোনো বিষয়ে দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করা।
সৃজনশীল কাজ: গল্প লেখা, কবিতা তৈরি বা নতুন ধারণা তৈরিতে সহায়তা করা।
৬. ব্যক্তিগতকরণ এবং অভিযোজন ক্ষমতা
জেমিনি ব্যবহারকারীর পছন্দ, অভ্যাস এবং অতীত কার্যকলাপ থেকে শিখতে পারে। এর ফলে এটি আরও ব্যক্তিগতকৃত এবং উপযোগী অভিজ্ঞতা প্রদান করতে সক্ষম হবে। সময়ের সাথে সাথে এটি আপনার প্রয়োজনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সহায়তা করবে।
৭. নিরাপত্তা এবং নীতিশাস্ত্রের প্রতি জোর
গুগল জেমিনির বিকাশে নিরাপত্তা এবং নৈতিকতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। ভুল তথ্য ছড়ানো বা ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু তৈরি করা থেকে বিরত থাকার জন্য এটি কঠোরভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা এবং এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গুগল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
৮. রিয়েল-টাইম মাল্টিমোডাল ইন্টারেকশন
জেমিনি কেবল টেক্সট, ছবি বা অডিও বুঝতে পারে না, এটি রিয়েল-টাইমে এই সব তথ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবে। এর অর্থ হলো, আপনি যখন কথা বলবেন, জেমিনি আপনার মুখের ভাবভঙ্গি, শারীরিক ভাষা এবং পরিবেশের শব্দ বিশ্লেষণ করে আপনার উদ্দেশ্য আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি একটি রেসিপি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন এবং একই সাথে রান্না করার ভিডিও দেখান, জেমিনি উভয় উৎস থেকে তথ্য নিয়ে আপনাকে আরও সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেবে।
৯. অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স এবং ফিজিক্যাল ইন্টারেকশন
গুগল জেমিনিকে শুধুমাত্র ডিজিটাল জগতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। এটি রোবোটিক্সের সাথে একীভূত হয়ে বাস্তব জগতে কাজ করতে সক্ষম হবে। এর মানে হলো, জেমিনি এমন রোবট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে যা জটিল কাজ সম্পাদন করে, যেমন - ঘরে জিনিসপত্র সাজানো, ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা অথবা এমনকি মানববিহীন যানবাহন পরিচালনা করা। এটি কেবল নির্দেশের উপর ভিত্তি করে কাজ করবে না, বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
১০. ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট
জেমিনি আপনার জন্য একটি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে, যা আপনার বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করবে। এটি আপনার ইমেল, ক্যালেন্ডার এবং অন্যান্য ডিজিটাল টুলগুলির সাথে সংযুক্ত হয়ে আপনার মিটিং শিডিউল করবে, গুরুত্বপূর্ণ ইমেলগুলোর সারাংশ তৈরি করবে এবং আপনার পছন্দ অনুযায়ী তথ্য খুঁজে বের করবে। এই এজেন্ট আপনার ডিজিটাল জীবনকে আরও সুসংগঠিত এবং কার্যকর করে তুলবে।
১১. বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আবিষ্কারে ত্বরণ
জেমিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ডেটা বিশ্লেষণ করতে, হাইপোথিসিস তৈরি করতে এবং নতুন পদার্থের বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হবে। এটি নতুন ওষুধ আবিষ্কার, জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলিং এবং পদার্থ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি গবেষকদের ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্যাটার্ন শনাক্তকরণে সময় বাঁচিয়ে দেবে, যার ফলে নতুন আবিষ্কারের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে।
১২. সৃজনশীল শিল্পে বিপ্লব
সৃজনশীল ক্ষেত্রের জন্য জেমিনি একটি শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। এটি সঙ্গীত রচনা, চিত্রকর্ম তৈরি, গল্প এবং চিত্রনাট্য লেখায় শিল্পীদের সহায়তা করবে। জেমিনি শিল্পীর স্টাইল বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী নতুন ধারণা বা বিকল্প তৈরি করে দেবে। এটি সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং দ্রুত করবে, যার ফলে নতুন ধরণের শিল্পকর্ম তৈরি হবে।
১৩. উন্নত সাইবার নিরাপত্তা
জেমিনি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি সাইবার হামলা শনাক্ত করতে, হুমকির পূর্বাভাস দিতে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেগুলোকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। জেমিনি নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করবে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করবে, যার ফলে ডেটা এবং সিস্টেমগুলি আরও সুরক্ষিত থাকবে।
Saturday, July 19, 2025
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু অমূল্য গোপাল মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু অমূল্য গোপাল মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার নিভৃত এক গ্রাম ফতেপুর। একসময় এই গ্রাম ছিল ইতিহাস ও উচ্চশিক্ষার এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ। এখানেই বাস করতেন চ্যাটার্জী পরিবার, যাঁরা ব্রিটিশ আমলে উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানীয় পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই পরিবারের এক বিশিষ্ট সন্তান ছিলেন অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায়—একজন খ্যাতিমান ব্যারিস্টার ও কলকাতা জজ কোর্টের বিচারক। তাঁর বাবা গোপাল চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন একজন জজ।
তাঁদের পরিবারের ঐতিহ্য ও প্রজ্ঞার এমন নিদর্শন পাওয়া যায়, যা ফতেপুর গ্রামকে শুধুমাত্র একটি জনপদ নয়, ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে তোলে। অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধু ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নলডাঙ্গার রাজা বাহাদুর প্রমথ ভূষণ দেবদার এবং জয়দিয়ার রাজা সতীশ চন্দ্র রায় বাহাদুর। সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি ভাষায় তাঁর প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিল, যা সে সময়ের শিক্ষিত সমাজে একটি বিরল গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো।
তাঁর কলকাতার বাসস্থান ছিল বালিগঞ্জের ২৩/৩১ গড়িয়ারহাট রোডে, যেখানে বর্তমানে তাঁর বংশধরেরা বসবাস করছেন। ফতেপুর গ্রামে তাঁর ৮৮ শতক জমির উপর নির্মিত হয়েছিল একটি সুরম্য পাকা বাড়ি, যার নির্মাণশৈলী ছিল মুর্শিদাবাদের মোগল প্রভাবিত স্থাপত্যরীতি অনুসরণে। জানা যায়, মুর্শিদাবাদ থেকে রাজমিস্ত্রী এনে নির্মাণ করা হয় এই বাড়ি, যার প্রধান ফটক ও ঠাকুর ঘরের কিছু অংশ এখনও দৃশ্যমান রয়েছে।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় পুরো পরিবার ভারতে চলে যায়। জজ সাহেবের সেই প্রাসাদতুল্য বাড়িটি পরবর্তীতে মৎস্য অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নতুন অফিস গঠনের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং ১৯৯৬ সালে কিছু ভূমিহীন পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে।
এই জমি এবং স্থাপনাটি কেবল একটি বসতভিটা নয়—এটি আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর পারিবারিক অবদানকে সংরক্ষণ করা শুধু অতীতের প্রতি সম্মান নয়, বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান শিক্ষাও বটে।
এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সময়ের দাবি।
Friday, July 18, 2025
প্রকাশিত লেখা কবিতা "মুখোশের আড়ালে"
দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকার সাহিত্য সঞ্চিতা পাতায় প্রকাশিত হলো আমার লেখা কবিতা "মুখোশের আড়ালে"।অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয় সম্পাদক।।
Thursday, July 17, 2025
চলিত ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা যশোরের সন্তান প্রমথ চৌধুরী
চলিত ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা যশোরের সন্তান প্রমথ চৌধুরী
বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরীর নাম এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক বা সম্পাদকই নন, ছিলেন বাংলা গদ্যের এক নির্ভীক সংস্কারক ও নতুন ধারার রূপকার। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান—চলিত রীতির প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা।
বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা গদ্যভাষা ছিল মূলত সাধু রীতিনির্ভর। এই ভাষা ছিল প্রাঞ্জল ও মার্জিত হলেও সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। সাহিত্যে একধরনের দূরত্ব ও আড়ম্বরিকতা কাজ করত। এই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটান প্রমথ চৌধুরী। তিনি উপলব্ধি করেন, সাহিত্যের ভাষা হতে হবে জীবন্ত, স্বাভাবিক ও কথ্য রীতিনির্ভর। সেই ভাবনা থেকেই ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা গদ্যে তিনি নবরীতি প্রবর্তন করেন—যা পরে পরিচিতি পায় ‘চলিত রীতি’ নামে।
১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে জন্ম নেওয়া প্রমথ চৌধুরী ছিলেন পাবনা জেলার চাটমোহরের জমিদার পরিবার পৈতৃকভাবে অভিজাত, আবার মননেও উদার। তাঁর পিতার নাম দুর্গাদাস চৌধুরী এবং মাতার নাম ছিল মগ্নময়ী দেবী। প্রমথ চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা। তাঁর মায়ের নাম ছিল সুকুমারী দেবী, যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো বোন। পরবর্তীতে প্রমথ চৌধুরী বিয়ে করেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে। সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই। এই সূত্রে প্রমথ চৌধুরী হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা।
এই সম্পর্কের কারণে প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্য জীবনে ঠাকুর পরিবারের প্রভাব অনস্বীকার্য। তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এবং কবিগুরু নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, গদ্যরচনায় প্রমথ চৌধুরীর প্রভাব তিনি অনুভব করেছিলেন।
তাঁর শিক্ষা ও রুচির পরিপক্বতা, এবং ইংরেজি সাহিত্যপাঠের গভীরতা তাঁকে করে তোলে প্রগাঢ় সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে বিএ এবং ইংরেজিতে এমএ পাস করেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারি পাশ করে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার প্রতি অনুরাগ তাঁকে সরকারি চাকরি ছেড়ে সাহিত্য-সম্পাদনায় নিয়ে আসে।
‘সবুজপত্র’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি চালু করেন এমন এক গদ্যভাষা, যেখানে বক্তৃতামূলক ভারিক্কি ভাষার বদলে কথ্যরীতির সহজতা ও সাবলীলতা দেখা যায়। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যরস গ্রহণের প্রধান শর্ত হচ্ছে ভাষার স্বাভাবিকতা। তিনি বলেন, “যে ভাষায় আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে সহজ বোধ করি, সেই ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত।”
চলিত রীতির এই গদ্যরীতি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধে যেমন স্বচ্ছন্দভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি তা পরবর্তীকালে অন্য লেখকদের লেখাতেও জনপ্রিয়তা পায়। এই পত্রিকাই ছিল চলিত ভাষায় সাহিত্যচর্চার এক বলিষ্ঠ মঞ্চ। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁর ভাষারীতির দ্বারা প্রভাবিত হন।
প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতির ভাষায় একটি বিশেষ সৌন্দর্য ছিল—তাতে ছিল স্বাভাবিকতা, বুদ্ধিদীপ্ততা ও পরিশীলিত রসবোধ। তিনি প্রমাণ করেন, এই ভাষায় গুরুগম্ভীর দার্শনিক চিন্তা যেমন প্রকাশ করা যায়, তেমনি করা যায় হালকা হাস্যরস বা সমসাময়িক সমালোচনাও।প্রমথ চৌধুরীর লেখায় কৃত্রিমতার বালাই ছিল না। তাঁর গদ্যে ছিল বলিষ্ঠতা, প্রাণবন্ততা ও সরসতা। যে ভাষায় মানুষ কথা বলে, সেই ভাষায় তিনি সাহিত্য রচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, সাহিত্য পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাতে চাইলে ভাষা হতে হবে পাঠযোগ্য ও প্রাণবন্ত। এই চিন্তাধারা থেকেই তিনি সাধুভাষার গাম্ভীর্যকে সরিয়ে রেখে চলিত রীতিকে জনপ্রিয় করেন।
বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির পথিকৃৎ হিসেবে প্রমথ চৌধুরী যে অবদান রেখে গেছেন, তা আজও গদ্য রচনার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তাঁর হাতে বাংলা গদ্যভাষা যেমন প্রাণ পেয়েছে, তেমনি পেয়েছে সাহিত্যের মাটির গন্ধ।
চলিত রীতির প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যকে যে গতিময়তা ও সারল্য উপহার দিয়েছেন, তা আজও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি হয়ে আছে। সাহিত্য যেন কেবল উচ্চবর্গের বা কাব্যিকতার জন্য নয়—বরং সাধারণ পাঠকের প্রাণে প্রবেশ করার মাধ্যম—এই ভাবনাকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এজন্যই তাঁকে বাংলা গদ্যের এক নবজাগরণের মহানায়ক বলা যায়।
Wednesday, July 16, 2025
রায় পরিবার: বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন এক জগৎ উন্মোচনের কারিগর
রায় পরিবার: বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন এক জগৎ উন্মোচনের কারিগর
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে রায় পরিবার এমন এক নাম, যার হাত ধরে শিশুদের কল্পনার জগৎ পেয়েছে প্রাণ, শব্দ পেয়েছে রঙ, আর ছড়ার পাতা পেয়েছে সুর।রায় পরিবার বাংলা শিশুসাহিত্যে কেবল লিখে গেছেন তা নয়, তাঁরা শিশুমনের গভীর চিন্তা, অনুভব, কল্পনা ও আনন্দকে কেন্দ্র করে গড়েছেন
এক ভিন্ন সাহিত্যভুবন। এ পরিবার দেখিয়েছে, শিশুদের জন্য সাহিত্য মানে শুধুই পড়াশোনা নয়—তা হতে পারে হাসির, কল্পনার, রহস্যের এবং বিজ্ঞানচেতনার সাথী।শিশুরা যেমন নিস্পাপ, তেমনি কল্পনাপ্রবণ। তাদের মনের জগৎটি রঙে, স্বপ্নে ও কৌতূহলে পরিপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যে সেই শিশুমনের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন যে পরিবারটি, তারা হলেন রায় পরিবার—উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় এবং সন্দীপ রায়।কালিনাথ রায় ছিলেন একজন সুদর্শন, রুচিশীল এবং আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ব্যক্তি।তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্ব ছেলেবেলায় উপেন্দ্রকিশোরের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।তাঁর শৈশব ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির রসে ভরা। তাঁর পিতার জ্ঞান আর পারিবারিক পরিবেশের ছাপ তিনি বহন করেছেন আজীবন। ফলস্বরূপ, উপেন্দ্রকিশোর শুধু একজন লেখক হয়ে থেমে থাকেননি, হয়ে উঠেছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম—একাধারে চিত্রশিল্পী, সংগীতপ্রেমী, ছাপাখানার কারিগর এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তক।‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘টোটে কোম্পানি’, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’—প্রতিটি বইয়ে গল্পের পাশাপাশি নিজ হাতে আঁকা ছবি যোগ করে তিনি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছিলেন।তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকা। এটি ছিল শিশুদের জন্য এক নিজস্ব সাহিত্যপত্র, যেখানে গল্প ছিল, ছড়া ছিল, ছিল বিজ্ঞান, ভ্রমণ, ছবি ও ধাঁধা—সব মিলিয়ে যেন এক কল্পনার রাজ্য। পিতার পথ ধরে ছেলে সুকুমার রায়ের আগমন যেন এক ঝলক হাসির আলো। বাংলা ছড়াসাহিত্যে এমন অসামান্য প্রতিভা আর আসেননি। তাঁর ছড়াগুলি নিছক ছড়া নয়—সেগুলো ছিল শব্দ, রস ও কল্পনার এক দুর্দান্ত সংমিশ্রণ।‘আবোল তাবোল’, প্রকাশিত ১৯২৩ সালে, আজও শিশুমনে হাসির ঢেউ তোলে। "খাঁদু দাদু", "বিরিঞ্চি বাবাজি", "পাগলা দাশু"র মতো চরিত্রগুলো যেন বাস্তব থেকে বেশি কল্পনার মধ্যেই প্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর ‘হযবরল’ এক অনন্য গদ্য, যেখানে ছেলেমেয়েদের চিন্তার জগৎ জাগ্রত হয় ।সত্যজিৎ রায়ের পরিচয় মূলত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে একটি আলাদা স্থান দখল করে আছে। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাঠক, পরে সম্পাদক। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা চরিত্র আজ বাংলার প্রতিটি কিশোরের প্রিয় গোয়েন্দা।
ফেলুদার গল্পে শুধু রোমাঞ্চ নেই, রয়েছে তথ্য, ইতিহাস, যুক্তি, এবং দুর্দান্ত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। আবার, প্রফেসর শঙ্কু চরিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসেন সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ধারা—যা আগে শিশুসাহিত্যে ছিল না বললেই চলে।রায় পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মে সন্দীপ রায় পিতার চলচ্চিত্রের সহকারী হিসেবেই শুরু করেন যাত্রা। সত্যজিৎ রায় নিজে বলেছেন, “আমার শ্রেষ্ঠ সহকারী ছিল আমার ছেলে।” মাত্র ২২ বছর বয়সে, তিনি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরে, সন্দীপ রায় নিজে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘ফটিকচাঁদ’ ছবির মাধ্যমে, যা আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। এছাড়াও তিনি ফেলুদা সিরিজকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে কিশোরদের কাছে সাহিত্যের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
রায় পরিবার প্রমাণ করেছেন, শিশুর চোখ দিয়েই দেখা যায় জগতের সবচেয়ে সজীব রঙ, এবং শিশুর কল্পনাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি।
তাঁরা বাংলা শিশুসাহিত্যে কেবল একটি নতুন দ্বার নয়, গড়েছেন এক বিশাল রাজপ্রাসাদ—যেখানে প্রতিটি শিশু নিজের মতো করে হাঁটে, হাসে, ভাবে, কল্পনা করে। সেই রাজপ্রাসাদে আছে ছড়ার ছন্দ, গল্পের গন্ধ, রহস্যের রোমাঞ্চ আর বিজ্ঞানের বিস্ময়। এই পরিবার আমাদের শিখিয়েছেন—শিশুদের জন্য লেখা মানে হালকা কিছু নয়, বরং সেটা হতে পারে সাহিত্যের সবচেয়ে মননশীল, নান্দনিক ও শক্তিশালী শাখা।
রায় পরিবার শুধু সাহিত্য রচনা করেননি—তাঁরা শিশুমনের অনুভূতি, কল্পনা ও কৌতূহলের প্রতিটি প্রান্তর স্পর্শ করে গেছেন মমতায়, যত্নে ও সৃষ্টিশীলতার দীপ্তিতে। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন, শিশুসাহিত্য কোনো খেলা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি মেধা ও হৃদয়ের সম্মিলন, যেখানে প্রতিটি শব্দ বুনে দেয় স্বপ্ন, প্রতিটি গল্প তৈরি করে ভাবনার জগত।
Monday, July 14, 2025
বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী
বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী
-শুভ জিত দত্ত
বাংলার ইতিহাসে নারীদের মধ্যে যাঁরা শুধু রাজমহলের অলংকার হয়ে থাকেননি, বরং রাজকার্য, সমাজকল্যাণ ও মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রাণী ভবানী একটি উজ্জ্বল নাম। নাটোর রাজবংশের এই বিশিষ্ট রাণী ছিলেন ধন, ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যে অতুলনীয়, আবার মানবতা, দূরদর্শিতা ।
রাণী ভবানীর জীবন শুরু হয় এক নাটকীয় উপাখ্যানে। নাটোরের জমিদার রামকান্ত যখন একদিন শিকারে গিয়েছিলেন, তখনই তাঁর চোখে পড়ে এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা—আশ্রমকন্যা নন, বরং জমিদার কন্যা। সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ রামকান্ত তাঁকেই বিয়ে করার সংকল্প করেন। কিন্তু সেই কন্যা সহজে রাজি হননি। তিনি তিনটি কঠিন শর্ত দেন—এক বছর বাপের বাড়িতে থাকার স্বাধীনতা, দরিদ্রদের জমি দান, এবং নাটোর থেকে ছাতিয়ান পর্যন্ত রাস্তা লাল শালু দিয়ে মুড়ে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা। বিস্ময়কর হলেও সত্য, রামকান্ত সব শর্তই মেনে নেন। এই ঘটনাই বাংলা পেয়েছিল এক মহান রাণীকে—রাণী ভবানী।
রাণী ভবানীর ব্যক্তিজীবন ছিল যেমন বেদনাবিধুর, তেমনি কর্মজীবন ছিল অসাধারণ দৃষ্টান্তের। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ৩২ বছর বয়সে বিধবা হন। স্বামী রামকান্ত ১৮ বছর বয়সে রাজ্যভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর রাণী ভবানী নিজেই রাজকার্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এই দায়িত্ব তিনি পালন করেন দীর্ঘ ৫০ বছর, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত—১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে ৭৯ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন।
১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ঘটে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ—ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। সারা বাংলায় লাখো মানুষ অনাহারে প্রাণ হারান। এই সময় রাজকোষ শূন্য করে রাণী ভবানী মুক্তহস্তে দান করেন প্রজাদের অন্নকষ্ট নিবারণে। শুধু তাই নয়, তিনি খনন করান বহু পুকুর, প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট লাঘব করতে।
শিক্ষাবিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কাশীতে ১৭৫৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভবানীশ্বর শিবমন্দির, দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড, কুরুক্ষেত্রতলা প্রভৃতি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত তিনি নির্মাণ করেন "রাণী ভবানী রোড", যা পরবর্তীতে "বেনারস রোড" নামেও খ্যাত হয়।
তিনি ছিলেন রাজসিক জীবনের আড়ম্বরহীন, মানবতার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। নারীশক্তির প্রতীক এই রাণী ছিলেন একাধারে সাহসিনী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক এবং সমাজসেবিকা।
রাণী ভবানী শুধু নাটোরের এক রাণী ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাংলার ইতিহাসে মানবতার এক দীপ্ত প্রতিমূর্তি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে ক্ষমতা, ধন ও ঐশ্বর্য জনসেবায় ব্যবহার করা যায়। আজও তাঁর নাম স্মরণে আসে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও গৌরবে। বাংলার এই মহীয়সী নারী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই 'দানবীর রাণী ভবানী'—যাঁর আলো আজও অনন্ত কালের জন্য উজ্জ্বল হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।
Saturday, July 12, 2025
পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন
পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন
কলাপাতার এক কোণে রাখা সামান্য নুন-লেবু আর পাশে রাখা কড়াইশুঁটির কচুড়ি—শুধু মাত্র এই দৃশ্যটাই যথেষ্ট পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের গন্ধ নিতে।লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা, ঝুরঝুরে কুমড়োর ছক্কা, মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল কিংবা গরম গরম চিংড়ির কাটলেট—এসব যেন নস্টালজিয়া।এইসব এলাহি ভোজের শুরুটা কিন্তু আজকের মতো ছিল না। শ্রীহর্ষ রচিত ‘নৈষাধ চরিতে’ নল-দময়ন্তীর বিয়ের ভোজে ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাতের বর্ণনা রয়েছে, যা সেই সময়কার সমাজের ভোজনপ্রীতির ইঙ্গিত দেয়। প্রাচীন আর্য সমাজেও বিয়ের ভোজ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মাছের নানাবিধ পদ দিয়ে ভোজ শুরু হতো। সেই তালিকায় থাকত হরিণ, ছাগল, ভেড়া, এমনকি পাখির মাংসও।তবে অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় এই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যায়। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল–এ পাওয়া যায় তথ্যে, তখন বিয়েতে মাছ-মাংস পরিবেশন নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময়ের ভোজে পরিবেশিত হত নিরামিষ খাদ্য, যার নাম ছিল "ফলার"।এরপর সময়ের পরিক্রমায় ময়দার প্রচলন বাড়ে, আসে লুচি-আলুর দম কিংবা কুমড়োর তরকারি। ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় মাছ আর মাংস। আর বাঙালি তো এমনিতেই ভোজনরসিক! বিয়েবাড়ির আয়োজনও তাই রাজকীয় ভোজে রূপ নেয়। বরপক্ষ-কনেপক্ষ দুই তরফেই চলত পদের তালিকা নিয়ে প্রতিযোগিতা। অতিথি-অভ্যাগতরা সেই সব পদের স্বাদ নিয়ে ভরপুর উপভোগ করতেন বাঙালিয়ানার আতিথেয়তা।শেষ পাতে ঠাঁই পেত রাবড়ি, টক-মিষ্টি দই, মতিচুর লাড্ডু—একেকটি পদ যেন একেকটি ইতিহাসের অংশ। এই সব আয়োজন শুধু পেট ভরাত না, ভরিয়ে দিত মনও।সাদাভাতের পাশাপাশি থাকত ঘিভাত, পোলাওভাত। পাতে সাজানো থাকত আলু, বেগুন, পটলের ভাজা। নানারকম সবজি আর মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল তো থাকতই। মাছ দিয়ে থাকত চপ, ভাজা, চিংড়ির কাটলেট, কালিয়া—প্রতিটি পদেই ছিল আলাদা স্বাদ ও ভালোবাসার ছোঁয়া। তার সঙ্গে থাকত মুরগি, পাঁঠা কিংবা খাসির মাংস।ভোজের শেষে চাটনি, পাঁপড় ভাজা আর মিষ্টিমুখ—এ যেন চিরাচরিত বাঙালির রীতিনীতি। আজকের ডেজার্টের ধারণা তখন ছিল না, ছিল শুধুই রকমারি মিষ্টির পসরা: গোল্লা, সন্দেশ, ছানার পায়েস, রাবড়ি, চমচম, টক-মিষ্টি দই আর রসে ভেজা রসগোল্লা।বিয়ে মানে তো এক কথায় এলাহি আয়োজন, তবে আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল না হলেও সাধারণ পরিবারগুলোও বিয়ের ভোজে তাদের সাধ্যের মধ্যে সেরা আয়োজন করতেন। সেই আয়োজনে ছিল আন্তরিকতা, ছিল ঐতিহ্য আর ছিল অতিথিদের মুখে হাসি ফোটানোর এক অনন্য মানসিকতা।বাঙালি বিয়ের ভোজ তাই শুধুই খাবার নয়, এটি ছিল একটা সংস্কৃতি, একটা ভালোবাসার উৎসব—যার স্বাদ এখনো মনের গভীরে লেগে আছে।
বিয়েবাড়ির কথা মানেই কেবল ভুরিভোজ নয়—তখন এক বিশেষ গুরুত্ব পেত সাজপোশাক ও উপহারের আচার। একসময় বিয়ের নিমন্ত্রণ মানেই ভাবনা হতো, "কী উপহার দেওয়া হবে?"—এটাই ছিল বিয়ের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। উপহার বেছে নেওয়ার পেছনে থাকত আত্মীয়তার মায়া, সামাজিক সৌজন্যবোধ, আবার কখনো কখনো আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা।
বিয়েবাড়ির পোশাকে তেমন কোনো বিশেষ নিয়ম না থাকলেও, আলগা একটা জাঁকজমক ছিল। তবে সেটি আবার এতটা জৌলুসপূর্ণও ছিল না যে অন্য উৎসব বা অনুষ্ঠান থেকে তা আলাদা হয়। বরং বাঙালি সমাজে উৎসব মানেই কিছুটা আয়োজন, কিছুটা সাজ—সে বিয়ে হোক বা পূজা-পার্বণ।
ছেলেরা পরতেন গিলে কাজ করা পাঞ্জাবি, তার সঙ্গে ময়ূরপুচ্ছ (অথবা টুকটুকে রঙের) ধুতি। হাতে থাকত বেল ফুলের মালার বালা, পায়ে কাঁচা চামড়ার পাদুকা। গায়ে সুগন্ধি—যা তখন তেল বা আতরের মাধ্যমে ছড়ানো হতো।
মেয়েদের সাজে ছিল বেনারসি শাড়ির জৌলুস, গলায় সোনার গহনা, হাতে চুড়ি, পায়ে নুপূর। খোঁপায় জুঁই বা বেলের মালা গাঁথা থাকত সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে। আর এক বিশেষ রীতি ছিল ঠোঁট রাঙানো—কিন্তু লিপস্টিক দিয়ে নয়, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা ছিল তখনকার স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় অভ্যাস।
সুগন্ধি ব্যবহারের চল ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। পকেট আতর বা ছোট কাঁচের বোতলে রাখা গোলাপজল ছিল সাজের অনিবার্য অংশ। এমনকি শিশুরাও থাকত ছোট করে সেজে—মাথায় তেল দেয়া চুলে ফুল গোঁজা, হাতে মালা, গলায় ছোট গহনা।
উপহারসামগ্রী বলতে আজকের মতো সাজানো গিফট বক্স নয়, তখন উপহার হিসেবে দেওয়া হতো শাড়ি, ধুতি, পিতলের বাসন, মিষ্টির হাঁড়ি বা টাকাপয়সা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা নিজেদের হাতে বানানো কিছু উপহারও দিতেন—যেমন কারুকার্য করা চাদর, বা হস্তশিল্পের সামগ্রী।
সব মিলিয়ে, বিয়েবাড়ি মানে ছিল একটি সামাজিক সম্মিলন, সৌন্দর্যচর্চা, আতিথেয়তা আর ঐতিহ্যের মিলনমেলা, যার প্রতিটি অঙ্গেই মিশে থাকত বাঙালির হৃদয়ের উষ্ণতা।
Friday, July 11, 2025
নারী সমাজের আলোকবর্তিকা বিদ্যাসাগর -লেখনী : শুভ জিত দত্ত
নারী সমাজের আলোকবর্তিকা বিদ্যাসাগর
লেখনী : শুভ জিত দত্ত
পুরুষশাসিত সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত ছিল নারী সমাজ। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীদের মর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়েছেন নির্ভীকভাবে। তিনি নারীদের শুধু জীবনের অধিকারই নয়, 'শিক্ষা' নামক আলোর মাধ্যমে বাঁচার মূলমন্ত্র দিয়েছেন।
বিদ্যাসাগর ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ। ।রাজা রামমোহনের পথ অনুসরণ করে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সমাজ সংস্কারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মনে করতেন, কোনো সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি নারীরা অনগ্রসর, অধিকারহীন ও কুসংস্কারগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। তিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের একজন নির্ভীক সমর্থক ছিলেন। তখনকার সমাজে নারীরা এতটাই দুর্বল ও অবহেলিত ছিল যে, তারা নিপীড়নের মধ্যেও নিজের মুক্তির স্বপ্ন দেখার সাহস পেত না। তিনি ভারত বষের্র নারী সমাজকে শিক্ষার মধ্যমে বাচাঁর প্রেরণা দিয়েছিলেন।বীরসিংহ গ্রামের ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্রের খেলার সঙ্গী ছিলেন পাশের বাড়ির এক বালিকা। বাল্যবিয়ের পর অল্প বয়সেই সে বিধবা হয়। জীবনের সব রঙ হারিয়ে ছোট্ট মেয়েটি হয়ে ওঠে এক বৈধব্যের নিঃসঙ্গ প্রতিচ্ছবি। একাদশীর দিনে যখন গ্রামের সব শিশু আনন্দে খাবার খাচ্ছিল, তখন সেই ছোট্ট মেয়েটি উপোস করে একা বসে ছিল, শুধুমাত্র বিধবা হওয়ার ‘অপরাধে’। কারণ, তখনকার রীতি অনুযায়ী বিধবাদের একাদশীতে খাওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। ঘটনাটি ঈশ্বরচন্দ্রের শিশু মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একটি নিষ্পাপ প্রাণ কীভাবে সমাজের কুসংস্কার ও নিষ্ঠুরতায় বন্দি হয়ে পড়তে পারে—সেই প্রশ্ন তাকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তখনই সে নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নারীর অধিকার রক্ষায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন—প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদনপত্র ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেন, যাতে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে বৈধতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালেই ‘হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ পাশ হয়। বিধবাদের প্রতি সমাজের নিষ্ঠুরতা দূর করে বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের মুক্তির স্বাদ এনে দেন তিনি।নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ সম্পন্ন করে তিনি সমাজে এক সাহসিক উদাহরণ সৃষ্টি করেন। এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজপতিদের তীব্র বিরোধিতা, উপহাস ও বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছিল। তবে কোনো বাধাই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্তে রক্ষণশীল সমাজ উত্তাল হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে আসে বিদ্রূপ, ঘৃণা আর হুমকি। পরিস্থিতি এতটাই হিংসাত্মক হয়ে ওঠে যে, পিতা ঠাকুরদাস চট্টোপাধ্যায় পুত্রের নিরাপত্তার জন্য নিজ গ্রাম বীরসিংহ থেকে লেঠেল পাঠাতে বাধ্য হন। বিধবাবিবাহ যেন এক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। পত্রপত্রিকা, পণ্ডিতদের সভা, মহিলা সমাজ এমনকি সাধারণ কৃষকের ক্ষেতেও একটাই আলোচনা—বিধবাবিবাহ ও বিদ্যাসাগরের জয়গান। সেই সময় পথে-ঘাটে ছড়া কাটত সাধারণ মানুষ:
"বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে, সদরে করেছে রিপোর্ট, বিধবার হবে বিয়ে!"
এই ছড়া শুধুই এক সাহসী সংস্কারকের প্রতি ভালোবাসা নয়, এটা ছিল বাঙালির অন্তরের আর্তি—এক আলোকবর্তিকার চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলন নিঃসন্দেহে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে এক বিপ্লবী পদক্ষেপ। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে শান্তিপুরের তাঁতিরা তাঁর নাম বুনে দিলেন কাপড়ে—"বেঁচে থাকুন বিদ্যাসাগর"। সেই শাড়ি পরিধান করে নারীরা যেন এক মৌন প্রতিবাদ ও সম্মতির বার্তা দিচ্ছিলেন। বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের পাশাপাশি তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন বহুবিবাহের মতো কুপ্রথা নির্মূলের জন্য।তাঁর সময়কার সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার ও অন্ধ গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন—বাল্যবিবাহ, সতীদাহ, বিধবাদের একাদশী পালন, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, জাতপাতের ভেদাভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি—সব মিলিয়ে এক অমানবিক সমাজচিত্র। একদিকে সমাজে নারীর সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক অন্যায়ের অবসান ঘটানো ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮৬০ সালে সরকারিভাবে কন্যাদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স দশ বছর নির্ধারণ করা হয়—যা সেই সময়কার রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু নারী মুক্তির আদর্শপ্রচারেই থেমে থাকেননি, বরং নারীশিক্ষা বিস্তারে তিনি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।বিদ্যাসাগরের উদ্যোগেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয় ।এই বিদ্যালয়ই পরবর্তীতে বেথুন স্কুল নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠা নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল, যা ভারতীয় নারী সমাজের জন্য নতুন পথ উন্মোচন করে দেয় । ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল নারীশিক্ষার প্রসারে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। গ্রামবাংলার নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় গড়ে তোলেন স্ত্রীশিক্ষা বিধায়নী সম্মেলনী। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১৩০০-এর বেশি ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করত।
তিনি শুধু স্কুল স্থাপন করেই থেমে যাননি, সরকারের কাছে ধারাবাহিকভাবে তদবির করে এসব বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যয়ভার বহনে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করেন।ব্রিটিশ সরকার যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলোর আর্থিক দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তিনি নিজের অর্থে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও স্কুলের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন। এ ছিল এক অকুতোভয় সমাজ সংস্কারকের আত্মোৎসর্গ। এর ফলেই ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৮৮-তে, যা নারীশিক্ষার ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।
নারীশিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষার দিকেও নজর দেন। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত। মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিজের জন্মগ্রাম বীরসিংহে প্রতিষ্ঠা করেন ভগবতী বিদ্যালয়।
পুরো সমাজ বদলে যায়নি, তবে বদলের সূচনা হয়েছিল—যার ভিত্তি আজকের নারী অধিকার আন্দোলনের শিকড়।





.png)
.png)

.png)
.png)

.png)

