রায় পরিবার: বাংলা শিশুসাহিত্যে নতুন এক জগৎ উন্মোচনের কারিগর
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে রায় পরিবার এমন এক নাম, যার হাত ধরে শিশুদের কল্পনার জগৎ পেয়েছে প্রাণ, শব্দ পেয়েছে রঙ, আর ছড়ার পাতা পেয়েছে সুর।রায় পরিবার বাংলা শিশুসাহিত্যে কেবল লিখে গেছেন তা নয়, তাঁরা শিশুমনের গভীর চিন্তা, অনুভব, কল্পনা ও আনন্দকে কেন্দ্র করে গড়েছেন
এক ভিন্ন সাহিত্যভুবন। এ পরিবার দেখিয়েছে, শিশুদের জন্য সাহিত্য মানে শুধুই পড়াশোনা নয়—তা হতে পারে হাসির, কল্পনার, রহস্যের এবং বিজ্ঞানচেতনার সাথী।শিশুরা যেমন নিস্পাপ, তেমনি কল্পনাপ্রবণ। তাদের মনের জগৎটি রঙে, স্বপ্নে ও কৌতূহলে পরিপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যে সেই শিশুমনের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন যে পরিবারটি, তারা হলেন রায় পরিবার—উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় এবং সন্দীপ রায়।কালিনাথ রায় ছিলেন একজন সুদর্শন, রুচিশীল এবং আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ব্যক্তি।তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্ব ছেলেবেলায় উপেন্দ্রকিশোরের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।তাঁর শৈশব ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির রসে ভরা। তাঁর পিতার জ্ঞান আর পারিবারিক পরিবেশের ছাপ তিনি বহন করেছেন আজীবন। ফলস্বরূপ, উপেন্দ্রকিশোর শুধু একজন লেখক হয়ে থেমে থাকেননি, হয়ে উঠেছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাম—একাধারে চিত্রশিল্পী, সংগীতপ্রেমী, ছাপাখানার কারিগর এবং বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তক।‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘টোটে কোম্পানি’, ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’—প্রতিটি বইয়ে গল্পের পাশাপাশি নিজ হাতে আঁকা ছবি যোগ করে তিনি শিশুদের কল্পনাশক্তিকে পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছিলেন।তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকা। এটি ছিল শিশুদের জন্য এক নিজস্ব সাহিত্যপত্র, যেখানে গল্প ছিল, ছড়া ছিল, ছিল বিজ্ঞান, ভ্রমণ, ছবি ও ধাঁধা—সব মিলিয়ে যেন এক কল্পনার রাজ্য। পিতার পথ ধরে ছেলে সুকুমার রায়ের আগমন যেন এক ঝলক হাসির আলো। বাংলা ছড়াসাহিত্যে এমন অসামান্য প্রতিভা আর আসেননি। তাঁর ছড়াগুলি নিছক ছড়া নয়—সেগুলো ছিল শব্দ, রস ও কল্পনার এক দুর্দান্ত সংমিশ্রণ।‘আবোল তাবোল’, প্রকাশিত ১৯২৩ সালে, আজও শিশুমনে হাসির ঢেউ তোলে। "খাঁদু দাদু", "বিরিঞ্চি বাবাজি", "পাগলা দাশু"র মতো চরিত্রগুলো যেন বাস্তব থেকে বেশি কল্পনার মধ্যেই প্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর ‘হযবরল’ এক অনন্য গদ্য, যেখানে ছেলেমেয়েদের চিন্তার জগৎ জাগ্রত হয় ।সত্যজিৎ রায়ের পরিচয় মূলত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে একটি আলাদা স্থান দখল করে আছে। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ‘সন্দেশ’ পত্রিকার পাঠক, পরে সম্পাদক। তাঁর সৃষ্ট ফেলুদা চরিত্র আজ বাংলার প্রতিটি কিশোরের প্রিয় গোয়েন্দা।
ফেলুদার গল্পে শুধু রোমাঞ্চ নেই, রয়েছে তথ্য, ইতিহাস, যুক্তি, এবং দুর্দান্ত পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। আবার, প্রফেসর শঙ্কু চরিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসেন সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ধারা—যা আগে শিশুসাহিত্যে ছিল না বললেই চলে।রায় পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মে সন্দীপ রায় পিতার চলচ্চিত্রের সহকারী হিসেবেই শুরু করেন যাত্রা। সত্যজিৎ রায় নিজে বলেছেন, “আমার শ্রেষ্ঠ সহকারী ছিল আমার ছেলে।” মাত্র ২২ বছর বয়সে, তিনি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরে, সন্দীপ রায় নিজে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘ফটিকচাঁদ’ ছবির মাধ্যমে, যা আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। এছাড়াও তিনি ফেলুদা সিরিজকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে কিশোরদের কাছে সাহিত্যের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
রায় পরিবার প্রমাণ করেছেন, শিশুর চোখ দিয়েই দেখা যায় জগতের সবচেয়ে সজীব রঙ, এবং শিশুর কল্পনাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি।
তাঁরা বাংলা শিশুসাহিত্যে কেবল একটি নতুন দ্বার নয়, গড়েছেন এক বিশাল রাজপ্রাসাদ—যেখানে প্রতিটি শিশু নিজের মতো করে হাঁটে, হাসে, ভাবে, কল্পনা করে। সেই রাজপ্রাসাদে আছে ছড়ার ছন্দ, গল্পের গন্ধ, রহস্যের রোমাঞ্চ আর বিজ্ঞানের বিস্ময়। এই পরিবার আমাদের শিখিয়েছেন—শিশুদের জন্য লেখা মানে হালকা কিছু নয়, বরং সেটা হতে পারে সাহিত্যের সবচেয়ে মননশীল, নান্দনিক ও শক্তিশালী শাখা।
রায় পরিবার শুধু সাহিত্য রচনা করেননি—তাঁরা শিশুমনের অনুভূতি, কল্পনা ও কৌতূহলের প্রতিটি প্রান্তর স্পর্শ করে গেছেন মমতায়, যত্নে ও সৃষ্টিশীলতার দীপ্তিতে। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন, শিশুসাহিত্য কোনো খেলা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি মেধা ও হৃদয়ের সম্মিলন, যেখানে প্রতিটি শব্দ বুনে দেয় স্বপ্ন, প্রতিটি গল্প তৈরি করে ভাবনার জগত।
.png)
No comments:
Post a Comment