Showing posts with label বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী. Show all posts
Showing posts with label বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী. Show all posts

Monday, July 14, 2025

বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী

 বাংলার হৃদয়ে মানবতার দীপশিখা রাণী ভবানী

-শুভ জিত দত্ত 

বাংলার ইতিহাসে নারীদের মধ্যে যাঁরা শুধু রাজমহলের অলংকার হয়ে থাকেননি, বরং রাজকার্য, সমাজকল্যাণ ও মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রাণী ভবানী একটি উজ্জ্বল নাম। নাটোর রাজবংশের এই বিশিষ্ট রাণী ছিলেন ধন, ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যে অতুলনীয়, আবার মানবতা, দূরদর্শিতা ।


রাণী ভবানীর জীবন শুরু হয় এক নাটকীয় উপাখ্যানে। নাটোরের জমিদার রামকান্ত যখন একদিন শিকারে গিয়েছিলেন, তখনই তাঁর চোখে পড়ে এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা—আশ্রমকন্যা নন, বরং জমিদার কন্যা। সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ রামকান্ত তাঁকেই বিয়ে করার সংকল্প করেন। কিন্তু সেই কন্যা সহজে রাজি হননি। তিনি তিনটি কঠিন শর্ত দেন—এক বছর বাপের বাড়িতে থাকার স্বাধীনতা, দরিদ্রদের জমি দান, এবং নাটোর থেকে ছাতিয়ান পর্যন্ত রাস্তা লাল শালু দিয়ে মুড়ে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা। বিস্ময়কর হলেও সত্য, রামকান্ত সব শর্তই মেনে নেন। এই ঘটনাই বাংলা পেয়েছিল এক মহান রাণীকে—রাণী ভবানী।


রাণী ভবানীর ব্যক্তিজীবন ছিল যেমন বেদনাবিধুর, তেমনি কর্মজীবন ছিল অসাধারণ দৃষ্টান্তের। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ৩২ বছর বয়সে বিধবা হন। স্বামী রামকান্ত ১৮ বছর বয়সে রাজ্যভার গ্রহণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর রাণী ভবানী নিজেই রাজকার্যের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এই দায়িত্ব তিনি পালন করেন দীর্ঘ ৫০ বছর, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত—১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে ৭৯ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন।


১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ঘটে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ—ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। সারা বাংলায় লাখো মানুষ অনাহারে প্রাণ হারান। এই সময় রাজকোষ শূন্য করে রাণী ভবানী মুক্তহস্তে দান করেন প্রজাদের অন্নকষ্ট নিবারণে। শুধু তাই নয়, তিনি খনন করান বহু পুকুর, প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট লাঘব করতে।


শিক্ষাবিস্তারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কাশীতে ১৭৫৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভবানীশ্বর শিবমন্দির, দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড, কুরুক্ষেত্রতলা প্রভৃতি ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত তিনি নির্মাণ করেন "রাণী ভবানী রোড", যা পরবর্তীতে "বেনারস রোড" নামেও খ্যাত হয়।


তিনি ছিলেন রাজসিক জীবনের আড়ম্বরহীন, মানবতার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। নারীশক্তির প্রতীক এই রাণী ছিলেন একাধারে সাহসিনী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক এবং সমাজসেবিকা।


রাণী ভবানী শুধু নাটোরের এক রাণী ছিলেন না—তিনি ছিলেন বাংলার ইতিহাসে মানবতার এক দীপ্ত প্রতিমূর্তি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে ক্ষমতা, ধন ও ঐশ্বর্য জনসেবায় ব্যবহার করা যায়। আজও তাঁর নাম স্মরণে আসে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও গৌরবে। বাংলার এই মহীয়সী নারী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই 'দানবীর রাণী ভবানী'—যাঁর আলো আজও অনন্ত কালের জন্য উজ্জ্বল হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।