Showing posts with label পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন. Show all posts
Showing posts with label পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন. Show all posts

Saturday, July 12, 2025

পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন

 পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের এলাহি আয়োজন


কলাপাতার এক কোণে রাখা সামান্য নুন-লেবু আর পাশে রাখা কড়াইশুঁটির কচুড়ি—শুধু মাত্র এই দৃশ্যটাই যথেষ্ট পুরনো দিনের বাঙালি বিয়ের গন্ধ নিতে।লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা, ঝুরঝুরে কুমড়োর ছক্কা, মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল কিংবা গরম গরম চিংড়ির কাটলেট—এসব যেন নস্টালজিয়া।এইসব এলাহি ভোজের শুরুটা কিন্তু আজকের মতো ছিল না। শ্রীহর্ষ রচিত ‘নৈষাধ চরিতে’ নল-দময়ন্তীর বিয়ের ভোজে ধোঁয়া-ওঠা গরম ভাতের বর্ণনা রয়েছে, যা সেই সময়কার সমাজের ভোজনপ্রীতির ইঙ্গিত দেয়। প্রাচীন আর্য সমাজেও বিয়ের ভোজ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মাছের নানাবিধ পদ দিয়ে ভোজ শুরু হতো। সেই তালিকায় থাকত হরিণ, ছাগল, ভেড়া, এমনকি পাখির মাংসও।তবে অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় এই চিত্রে পরিবর্তন দেখা যায়। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল–এ পাওয়া যায় তথ্যে, তখন বিয়েতে মাছ-মাংস পরিবেশন নিষিদ্ধ ছিল। সেই সময়ের ভোজে পরিবেশিত হত নিরামিষ খাদ্য, যার নাম ছিল "ফলার"।এরপর সময়ের পরিক্রমায় ময়দার প্রচলন বাড়ে, আসে লুচি-আলুর দম কিংবা কুমড়োর তরকারি। ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় মাছ আর মাংস। আর বাঙালি তো এমনিতেই ভোজনরসিক! বিয়েবাড়ির আয়োজনও তাই রাজকীয় ভোজে রূপ নেয়। বরপক্ষ-কনেপক্ষ দুই তরফেই চলত পদের তালিকা নিয়ে প্রতিযোগিতা। অতিথি-অভ্যাগতরা সেই সব পদের স্বাদ নিয়ে ভরপুর উপভোগ করতেন বাঙালিয়ানার আতিথেয়তা।শেষ পাতে ঠাঁই পেত রাবড়ি, টক-মিষ্টি দই, মতিচুর লাড্ডু—একেকটি পদ যেন একেকটি ইতিহাসের অংশ। এই সব আয়োজন শুধু পেট ভরাত না, ভরিয়ে দিত মনও।সাদাভাতের পাশাপাশি থাকত ঘিভাত, পোলাওভাত। পাতে সাজানো থাকত আলু, বেগুন, পটলের ভাজা। নানারকম সবজি আর মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল তো থাকতই। মাছ দিয়ে থাকত চপ, ভাজা, চিংড়ির কাটলেট, কালিয়া—প্রতিটি পদেই ছিল আলাদা স্বাদ ও ভালোবাসার ছোঁয়া। তার সঙ্গে থাকত মুরগি, পাঁঠা কিংবা খাসির মাংস।ভোজের শেষে চাটনি, পাঁপড় ভাজা আর মিষ্টিমুখ—এ যেন চিরাচরিত বাঙালির রীতিনীতি। আজকের ডেজার্টের ধারণা তখন ছিল না, ছিল শুধুই রকমারি মিষ্টির পসরা: গোল্লা, সন্দেশ, ছানার পায়েস, রাবড়ি, চমচম, টক-মিষ্টি দই আর রসে ভেজা রসগোল্লা।বিয়ে মানে তো এক কথায় এলাহি আয়োজন, তবে আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল না হলেও সাধারণ পরিবারগুলোও বিয়ের ভোজে তাদের সাধ্যের মধ্যে সেরা আয়োজন করতেন। সেই আয়োজনে ছিল আন্তরিকতা, ছিল ঐতিহ্য আর ছিল অতিথিদের মুখে হাসি ফোটানোর এক অনন্য মানসিকতা।বাঙালি বিয়ের ভোজ তাই শুধুই খাবার নয়, এটি ছিল একটা সংস্কৃতি, একটা ভালোবাসার উৎসব—যার স্বাদ এখনো মনের গভীরে লেগে আছে।

বিয়েবাড়ির কথা মানেই কেবল ভুরিভোজ নয়—তখন এক বিশেষ গুরুত্ব পেত সাজপোশাক ও উপহারের আচার। একসময় বিয়ের নিমন্ত্রণ মানেই ভাবনা হতো, "কী উপহার দেওয়া হবে?"—এটাই ছিল বিয়ের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। উপহার বেছে নেওয়ার পেছনে থাকত আত্মীয়তার মায়া, সামাজিক সৌজন্যবোধ, আবার কখনো কখনো আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা।

বিয়েবাড়ির পোশাকে তেমন কোনো বিশেষ নিয়ম না থাকলেও, আলগা একটা জাঁকজমক ছিল। তবে সেটি আবার এতটা জৌলুসপূর্ণও ছিল না যে অন্য উৎসব বা অনুষ্ঠান থেকে তা আলাদা হয়। বরং বাঙালি সমাজে উৎসব মানেই কিছুটা আয়োজন, কিছুটা সাজ—সে বিয়ে হোক বা পূজা-পার্বণ।

ছেলেরা পরতেন গিলে কাজ করা পাঞ্জাবি, তার সঙ্গে ময়ূরপুচ্ছ (অথবা টুকটুকে রঙের) ধুতি। হাতে থাকত বেল ফুলের মালার বালা, পায়ে কাঁচা চামড়ার পাদুকা। গায়ে সুগন্ধি—যা তখন তেল বা আতরের মাধ্যমে ছড়ানো হতো।

মেয়েদের সাজে ছিল বেনারসি শাড়ির জৌলুস, গলায় সোনার গহনা, হাতে চুড়ি, পায়ে নুপূর। খোঁপায় জুঁই বা বেলের মালা গাঁথা থাকত সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে। আর এক বিশেষ রীতি ছিল ঠোঁট রাঙানো—কিন্তু লিপস্টিক দিয়ে নয়, পান খেয়ে ঠোঁট লাল করা ছিল তখনকার স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় অভ্যাস।

সুগন্ধি ব্যবহারের চল ছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। পকেট আতর বা ছোট কাঁচের বোতলে রাখা গোলাপজল ছিল সাজের অনিবার্য অংশ। এমনকি শিশুরাও থাকত ছোট করে সেজে—মাথায় তেল দেয়া চুলে ফুল গোঁজা, হাতে মালা, গলায় ছোট গহনা।

উপহারসামগ্রী বলতে আজকের মতো সাজানো গিফট বক্স নয়, তখন উপহার হিসেবে দেওয়া হতো শাড়ি, ধুতি, পিতলের বাসন, মিষ্টির হাঁড়ি বা টাকাপয়সা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা নিজেদের হাতে বানানো কিছু উপহারও দিতেন—যেমন কারুকার্য করা চাদর, বা হস্তশিল্পের সামগ্রী।

সব মিলিয়ে, বিয়েবাড়ি মানে ছিল একটি সামাজিক সম্মিলন, সৌন্দর্যচর্চা, আতিথেয়তা আর ঐতিহ্যের মিলনমেলা, যার প্রতিটি অঙ্গেই মিশে থাকত বাঙালির হৃদয়ের উষ্ণতা।