রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
১৮৮৩ সালের ২রা মে, চৈত্র কৃষ্ণাদশমী তিথিতে সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—দুই মহান আত্মার, শ্রীমৎ রামকৃষ্ণদেব ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র সাক্ষাৎ। স্থান ছিল উত্তর কলকাতার প্রফুল্ল স্ট্রিটের ২৩৪ নম্বর বাড়ি, যেটি ‘নন্দনবাগান’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে ব্রাহ্মসমাজের বিংশ সাংবাৎসরিক উৎসব উদযাপন চলছিল। এই উপলক্ষে ঠাকুর উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁর ভক্তদের—বিশেষত রাখাল মহারাজ (পরবর্তীতে স্বামী ব্রহ্মানন্দ)—সহ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল পাঁচটা নাগাদ কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ির সবচেয়ে বড় কক্ষে আয়োজিত হয় এক বিশেষ সভা। সভা শুরু হয় এক অনন্য শিল্পানুষ্ঠানে—ঠাকুর রামকৃষ্ণের অনুরোধে যুবক রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো বাজিয়ে পরিবেশন করেন নিজের লেখা ব্রহ্মসংগীত “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তরে।” এই গানটি যেন শুধু রামকৃষ্ণদেবের জন্যই লেখা হয়েছিল—তেমনই এক আত্মিক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।
গানটির ভেতরে ছিল গভীর আত্মসমর্পণের আহ্বান, যা শুনে শ্রীমৎ ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন—চোখে জল, হৃদয়ে ভক্তির উথান। আর সেই দৃশ্য দেখে ২২ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথও বিমুগ্ধ হয়ে যান। দুই মহান ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোনো কথোপকথনের দীর্ঘ বিবরণ নেই, কিন্তু তাঁদের ভেতরকার অনুভব ও মানসিক যোগাযোগ ছিল অনির্বচনীয়।
সভা শেষে ঠাকুর সকলের সঙ্গে বসে লুচি, ডাল, তরকারি ও মিষ্টি খান এবং আনন্দঘন পরিবেশে বিদায় জানিয়ে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যান।
এই একটি মাত্র সাক্ষাৎ যদিও সংক্ষিপ্ত ছিল, তবে তা দুই মহামানবের অন্তর্জগতের মিলনের এক অনন্য স্মারক হয়ে আছে ইতিহাসে। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও সুসম্পর্ক ছিল। ব্রাহ্মসমাজ ও রামকৃষ্ণ পরম্পরার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধ, এই সাক্ষাৎ যেন তারই এক শুভ চিহ্ন।

No comments:
Post a Comment