Monday, November 17, 2025

প্রাচীন মহেশপুরের ইতিহাস

 প্রাচীন মহেশপুরের ইতিহাস 


বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মহেশপুর কেবল একটি জনপদ নয়, বরং এটি প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বলয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।মহেশপুর কেবল ঝিনাইদহ জেলার একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের এক প্রাচীন ও জীবন্ত সংগ্রহশালা। রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সেন আমল ও কৈবর্ত শাসন—প্রতিটি যুগেই মহেশপুর তার নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল ছিল।মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, মহারাজ বলি ও মহর্ষি দীর্ঘতমার আশীর্বাদে পাঁচটি শক্তিশালী জনপদের সৃষ্টি হয়। এই পাঁচ পুত্রের নামে নামকরণ করা হয়— অঙ্গ, বঙ্গ, কালিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম। ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন পুণ্ড্র ও সুহ্ম জনপদের বিস্তৃতি আজকের যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, মহেশপুর প্রাচীন বঙ্গের সেই আদি সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক সীমানার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল।


ঐতিহ্যের মহেশপুরে সেন রাজবংশের পদচিহ্ন

মহেশপুরের ইতিহাসে সেন রাজবংশের একটি নাটকীয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে।সেন বংশের ইতিহাসে বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেনের যে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা শোনা যায়, মহেশপুরের ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে ঠিক সেখানেই। লোক-ইতিহাস অনুযায়ী, রাজা বল্লাল সেন যখন একজন নিম্নবর্ণীয় নারীকে গ্রহণ করেন, তখন তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে রাজ্য ত্যাগ করেন।পরবর্তীতে রাজা অনুতপ্ত হন এবং ঘোষণা করেন—যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বে তাঁর হারানো পুত্রকে ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাকে রাজ্যের একাংশ উপহার দেবেন। এই দুঃসাধ্য কাজে সফল হন সূর্যনারায়ণ নামক এক ব্যক্তি। পুরস্কার হিসেবে তিনি লাভ করেন সূর্যদ্বীপ অঞ্চল।ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই সূর্যনারায়ণের প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী গড়ে উঠেছিল আজকের মহেশপুরে। এই সূর্যনারায়ণ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ একজন শাসক।তাঁর শাসনের ফলেই একসময় এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি ‘সূর্য মাঝির দেশ’ নামে পরিচিতি পায়। আজও মহেশপুরের আনাচে-কানাচে সেই প্রাচীন ইতিহাসের রাজা সূর্যনারায়ণের সেই সমৃদ্ধ রাজধানীর স্মারক ও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়।

কৈবর্ত শাসন ও মহেশপুরের জলবেষ্টিত দ্বীপভূমি

সেন যুগের আগে বা সমসাময়িক সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় কৈবর্তরা অত্যন্ত শক্তিশালী স্থানীয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ছিলেন মূলত নদীবহুল অঞ্চলের মানুষ, তাই জলপথের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ছিল অবিসংবাদিত।তৎকালীন মহেশপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল আধুনিক কালের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রমত্তা ভৈরব নদী মহেশপুরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রবাহিত হতো। অসংখ্য নদী আর খাঁড়ির জালে ঘেরা এই জনপদটি তখন বহু ছোট-বড় দ্বীপ বা ‘ব-দ্বীপ’-এর সমষ্টি ছিল। প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যের জন্য এই দ্বীপগুলো ছিল অত্যন্ত নিরাপদ।

যোগীন্দ্রদ্বীপ থেকে মহেশপুর

এই দ্বীপভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বৃহত্তম দ্বীপটি ছিল ‘যোগীন্দ্রদ্বীপ’। বর্তমান বনগ্রামের উত্তর অংশ জুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপটি কেবল আয়তনেই বড় ছিল না, এটি ছিল অত্র অঞ্চলের ক্ষমতার উৎস বা প্রশাসনিক কেন্দ্র।এই বিশাল যোগীন্দ্রদ্বীপের প্রধান নগর হিসেবে গড়ে উঠেছিল মহেশপুর। জলবেষ্টিত এই নগরীতে প্রবেশের জন্য সুশৃঙ্খল নৌ-ব্যবস্থা ছিল, যা এই অঞ্চলকে তৎকালীন বাংলার এক অনন্য জলদুর্গ বা ‘Riverine Fortress’-এর মর্যাদা দিয়েছিল। এই দ্বীপের ঐতিহ্য ও সূর্য রাজার স্মৃতি আজও মহেশপুরের পরিচয় বহন করে চলেছে।

ব্রিটিশ আমলের বনগ্রাম মহকুমা ও আজকের মহেশপুর

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বর্তমান যশোর ও নদীয়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ‘কুশদ্বীপ’ নামে পরিচিত ছিল। পদ্মা, ভৈরব ও চিত্রা নদীবেষ্টিত এই দুর্গম অঞ্চলে রাজস্ব আদায় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কোম্পানি সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যেই কুশদ্বীপকে ভেঙে ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়, যার ফলে উদ্ভব ঘটে ‘বনগ্রাম’ (বর্তমান বনগাঁ) এলাকার।দীর্ঘ সময় ধরে বনগ্রাম ও মহেশপুর অঞ্চলটি নদীয়া ও যশোর জেলার মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। অবশেষে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন এক স্থায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়:বনগ্রাম মহকুমাকে স্থায়ীভাবে যশোর জেলার সাথে একীভূত করা হয়।এই মহকুমার অধীনে ছিল চারটি গুরুত্বপূর্ণ থানা: শার্শা, গাইঘাটা, বনগ্রাম ও মহেশপুর।সেই সময়ে মহেশপুর কেবল একটি থানাই ছিল না, বরং এটি ছিল এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। সীমান্তবর্তী অবস্থান ও উর্বর কৃষিজমির কারণে মহেশপুর ব্রিটিশ আমলেই এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেছিল।

বৃহত্তর যশোর জেলা ও মহেশপুর

মহেশপুরের ইতিহাস কেবল একটি জনপদের গল্প নয়, বরং এটি বৃহত্তর বাংলার প্রশাসনিক পরিবর্তনের এক জলজ্যান্ত দলিল। প্রাক-ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত মহেশপুরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে যশোর ছিল একটি প্রভাবশালী ও স্বতন্ত্র রাজ্য। স্থানীয় জমিদার ও রাজপরিবার পরিচালিত এই রাজ্যের মূল ভিত্তি ছিল কৃষি ও নদীপথের বাণিজ্য। নদ-নদীর প্রবাহ এবং কারুশিল্পের মেলবন্ধনে যশোর তখন দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার প্রধান শক্তির কেন্দ্র। সেই সময়ে মহেশপুর এই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর ছায়াতলে একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে ধীরে ধীরে নিজের গুরুত্ব তৈরি করে।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার ক্ষমতা দখল করে, তখন তারা তাদের রাজস্ব আদায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সুবিধার্থে পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো বদলে ফেলে। এর ফলে স্বাধীন যশোর রাজ্য প্রথমে যশোর ডিভিশনে রূপান্তরিত হয়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে কোম্পানি সরকার এই বড় অঞ্চলটিকে ডিভিশন ভিত্তিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে।প্রশাসনিক জটিলতা আরও কমাতে এবং স্থানীয় শাসনকে জনমানুষের কাছাকাছি নিতে পরবর্তীকালে বিশাল যশোর ডিভিশন ভেঙে বৃহত্তর যশোর জেলা গঠিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে পুলিশ প্রশাসন, আদালত এবং ভূমি জরিপ ব্যবস্থার একটি সুসংগঠিত রূপ তৈরি হয়। যশোর জেলার এই নতুন প্রশাসনিক মানচিত্রে মহেশপুর তখন একটি সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিচয় লাভ করে।ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের শাসন কাঠামো ছিল প্রেসিডেন্সি বিভাগ। একসময় যশোর ও খুলনা অঞ্চল একত্রে এই প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যবস্থার অধীনে রাজস্ব, ভূমি জরিপ এবং সামরিক তদারকি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হতো। যশোর ও খুলনার এই একীভূত অবস্থান দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাকে ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। মহেশপুর এই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বলয়ের অংশ হিসেবে সড়ক ও নৌপথের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।

 





প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাব

এই ধারাবাহিক প্রশাসনিক রূপান্তর শুধু কাগুজে পরিবর্তন ছিল না; এটি এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষভাবে—

১. বাণিজ্য

নদীপথ-নির্ভর পুরোনো বাণিজ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশরা বাজার, কুঠি এবং বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসেবে মহেশপুরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

২. কৃষি

জমিদারি প্রথা, ভূ-রাজস্ব ব্যবস্থা, সেচব্যবস্থা এবং ভূমি জরিপের নতুন নীতিমালা কৃষি উৎপাদন ও ভূমিব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। কৃষিজমির শ্রেণিবিন্যাস ও রাজস্ব আদায় পদ্ধতির ফলে মহেশপুরের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে।

৩. রেলপথ ও যোগাযোগ

ব্রিটিশ শাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রেলপথ নির্মাণ। যদিও মহেশপুরে সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হয়নি, তবুও যশোর–খুলনা অঞ্চলে রেলপথের বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং মহেশপুরের বাণিজ্যিক লেনদেন ও জনস্রোতে পরিবর্তন আনে।

৪. সংস্কৃতি ও সমাজ

প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, ডাক-বিভাগ, বাজার, হাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। এসব পরিবর্তন মহেশপুরের সমাজে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক বিন্যাস গড়ে তোলে— যাত্রা, লোকসংগীত, মেলা, বিদ্যালয় স্থাপন, পাড়াপ্রতিবেশী সমন্বয়—সব মিলিয়ে মহেশপুর নতুনভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

মহেশপুর: নতুন পরিচয়ের উত্থান

এই সব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মহেশপুর ধীরে ধীরে একটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সীমান্তবর্তী অবস্থান, হাট-বাজারের বিকাশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠার প্রসার, এবং লোককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিস্তার—এই সব মিলিয়ে মহেশপুরের পরিচয় পূর্বের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।


মহেশপুরের শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতি: এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

বনগ্রাম মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার যেসব অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার দ্রুত ঘটে, তার মধ্যে মহেশপুর বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই অঞ্চলে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ বাড়ে, আর এর ফলস্বরূপ মহেশপুরেই প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম মহকুমার অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয় শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদ্ভব, লেখাপড়া জানা কৃষিজীবী ও বণিক শ্রেণির বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে মহেশপুরে গড়ে ওঠে এক নতুন আলোকায়ন।

সমাজের গঠন ও বৈশিষ্ট্য

মহেশপুরের সমাজ কাঠামো ছিল বহুমাত্রিক। বিভিন্ন বর্ণ ও উপবর্ণের মানুষ এখানে বসবাস করলেও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়—

  • বর্ণভেদ ছিল, কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ ছিল না।
    গ্রামীণ সমাজের স্বাভাবিক স্তরবিন্যাস বজায় থাকলেও এই অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি ছিল সুস্পষ্ট। বিবাহ, হাট-বাজার, কৃষিকর্ম, উৎসব—সব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকত।

অর্থনৈতিক কাঠামো ও পেশা

মহেশপুরের অর্থনৈতিক জীবন ছিল মূলত কৃষি নির্ভর, তবে এ অঞ্চলে কারুশিল্প, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প এবং স্থানীয় বণিক শ্রেণির সক্রিয় উপস্থিতি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা প্রদান করে। কৃষিজ উৎপাদন, নিকটবর্তী বাজারগুলোর সক্রিয়তা এবং ছোট-বড় হাট-বাজারের মাধ্যমে এখানে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে—

  • কৃষিজীবী শ্রেণি

  • কারুশিল্পী

  • বণিক শ্রেণি
    —সবাই মিলেই মহেশপুরের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।

সংস্কৃতি ও লোকজ জীবন

এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল প্রাণবন্ত, বৈচিত্র্যময় এবং জনসম্পৃক্ত। মহেশপুরে বারোয়ারী যাত্রা, যাত্রাপালা, লোকগীতি, বাউল গান, পাঁচালি, মেলা-উৎসব—এসব ছিল মানুষের নিত্যজীবনের অংশ।
সাধারণ মানুষ যেমন কৃষিকাজে আনন্দ খুঁজে পেত, তেমনি সন্ধ্যার অলোয় সংস্কৃতিকেও লালন করত।

এই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো—

‘ট’ বাজারের চাঁদনিতে বার্ষিক যাত্রা উৎসব

বনগ্রাম ও গোপালনগর অঞ্চলের মধ্যবর্তী ‘ট’ বাজার ছিল এক ঐতিহাসিক সমাগমস্থল। প্রতি বছর এই বাজারের চাঁদনি তলায় অনুষ্ঠিত যাত্রা উৎসব পুরো মহেশপুর-সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষকে একত্র করত।
বিশেষত্ব ছিল—

  • সব বর্ণ, সব সম্প্রদায়ের মানুষ অভিন্ন আনন্দে অংশ নিত

  • পেশাভেদ, ধর্মভেদ বা সামাজিক দূরত্ব এখানে গুরুত্ব পেত না

  • যাত্রাপালা, লোকসঙ্গীত, নাট্যপ্রদর্শনী—সব মিলিয়ে তৈরি হতো বহুমাত্রিক লোকজ পরিবেশ

এই উৎসব ছিল শুধু বিনোদন নয়; সামাজিক ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও এক অনন্য ক্ষেত্র।


মহেশপুরে বনগ্রাম মহকুমার প্রাচীনতম বিদ্যালয়ের সূচনা:

বনগ্রাম মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার যে কেন্দ্রগুলো প্রথমে বিকশিত হয়, তার মধ্যে মহেশপুর ছিল অগ্রগণ্য। মহেশপুর অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবন, বাণিজ্যিক কার্যকলাপ ও আদি জনপদের সংগঠিত কাঠামোর কারণে এখানেই মহকুমার প্রাচীনতম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিদ্যালয়টি বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদাহ জেলার অন্তর্গত মহেশপুরে অবস্থিত।উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, বিশেষত ইংরেজ বর্ধিষ্ণু প্রশাসনিক নীতির ফলে শিক্ষা বিস্তারের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়। মহেশপুর, যেটি সেই সময় বনগ্রাম সাবডিভিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, সেখানে বিদ্যালয় স্থাপন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার নতুন ধারার সূচনা ঘটায়।মহেশপুরে প্রাচীন বিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশক পর বনগ্রামের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাবর্ষ ১৮৬৮ ইংরেজি, যা এই অঞ্চলের শিক্ষাগত বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।মহেশপুরে প্রাচীন বিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশক পর বনগ্রামের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়।তৎকালীন সময়ে বনগ্রাম কুশদ্বীপের বিভক্ত অংশ হিসেবে কখনো নদীয়া, কখনো যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রশাসনিক এই ওঠানামার মধ্যেও মহেশপুর ও বনগ্রামের বিদ্যালয়সমূহ।


যোগাযোগ:

বাগদহ থেকে উত্তর–পূর্ব সীমান্ত বয়রা পর্যন্ত বর্তমানে পিচঢালা সড়ক বিস্তৃত হয়েছে। একসময় এই অঞ্চল থেকেই বর্তমান বাংলাদেশের কোটচাঁদপুর ও মহেশপুরে যাওয়ার জন্য একটি কাঁচা রাস্তা ব্যবহৃত হতো। সময়ের বিবর্তনে সেই পুরোনো কাঁচা পথ আজ প্রায় লুপ্তপ্রায়; নতুন সড়কব্যবস্থার কারণে ঐতিহাসিক সেই রাস্তার অস্তিত্ব ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।


শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিতের শ্রীপাট — মহেশপুরের বৈষ্ণব ঐতিহ্যের প্রাচীন কেন্দ্র

তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত মহেশপুর উপজেলার প্রাচীন হলদা গ্রাম শুধুমাত্র একটি সাধারণ জনপদ নয়—এটি বাংলার বৈষ্ণব সাধনার এক অনন্য তীর্থস্থান। এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে বিশেষত দ্বাদশ গোপাল শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিত (সুদাম গোপাল)-এর স্মৃতিবহ শ্রীপাটকে কেন্দ্র করে।

শ্রীপাটের অবস্থান ও প্রাচীন স্থাপনা

হলদা গ্রামের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে, শান্তস্বভাব বেত্রবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই শ্রীপাট। নদীপথের ধারাবাহিকতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রশান্তি বৈষ্ণব সাধকদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছিল—যা আজও ইতিহাসের ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

এই শ্রীপাটেই স্থাপিত ছিল—

  • শ্রীশ্রী রাধাবল্লভ জিউ

  • শ্রীশ্রী রাধারমণ জিউ

এই দুই বৈষ্ণব বিগ্রহ বহু প্রজন্ম ধরে এখানে পূজিত হয়েছে। পরবর্তীকালে সৈদাবাদ অঞ্চলের গোস্বামীগণ বিশেষ কারণে বিগ্রহ স্থানান্তর করেন। তবে শ্রীপাটের ঐতিহ্য ও নিয়মিত পূজার মানসিকতা অটুট রাখতে স্থানীয় ভক্তসমাজ কাঠের বিগ্রহ (দারুময় মূর্তি) প্রতিষ্ঠা করে পূজা চালু রাখেন। আজও প্রতিদিন অর্ঘ্য, সেবাপূজা ও কীর্তনের মাধ্যমে এখানে বৈষ্ণব সাধনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

তিরোভাবোৎসব — বৈষ্ণব সমাজের মহোৎসব

প্রতি বছর অগ্রহায়ণী কৃষ্ণ পক্ষের প্রতিপদ তিথিতে পালিত হয় শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিতের তিরোভাবোৎসব। এই তিথি স্থানীয় বৈষ্ণবসমাজে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় পালন নয়, বরং তা এক মহোৎসবে পরিণত হয়। হাজারো ভক্ত, কীর্তনীয়, সাধু-মহাত্মা ও শ্রীমৎ ভাগবত অনুরাগীরা এই উৎসবে অংশ নিতে সমবেত হন।

উৎসবের প্রধান আকর্ষণ—

  • অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন

  • ভোগ-প্রসাদ বিতরণ

  • ভাগবত আলোচনা

  • গোপাল-পরম্পরার বংশীয়দের আচার-অনুষ্ঠান

এই উৎসব প্রতি বছর মহেশপুর অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক–ধর্মীয় সমাবেশ সৃষ্টি করে।

জমিদার পরিবারের সেবায়েতের দায়িত্ব

ইতিহাসে দেখা যায়, মহেশপুরের জমিদারগণ যুগের পর যুগ এই শ্রীপাটের প্রধান সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শ্রীপাটের জমি, সম্পত্তি, বিগ্রহ ও উৎসব পরিচালনা সংগঠিত হতো। জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই শ্রীপাটের পূজা-পার্বণ সুসংগঠিত থাকে এবং সামাজিক ঐতিহ্য অটুট থাকে।

গোপাল-পরম্পরা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য

শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিতের শিষ্যবংশ বর্তমানে মঙ্গলভিহি গ্রামে বসবাস করছেন। সেখানকার বিখ্যাত শ্রীশ্যামচাঁদ জিউ আজও নিয়মিত পূজিত হন। শিষ্যবংশীয়দের মাধ্যমে বৈষ্ণব দর্শন, নামতত্ত্ব, শ্রীমৎ ভাগবত ধর্ম ও গোপাল-লীলা প্রচারিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

শ্রীপাটের গুরুত্ব — ধর্মীয় কেন্দ্রের সীমা ছাড়িয়ে

মহেশপুরের হলদা গ্রামের এই শ্রীপাট কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, বরং—

  • বৈষ্ণব সাধনার গবেষণামূলক কেন্দ্র

  • গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসের অংশ

  • লোকসংস্কৃতি ও কীর্তনের জীবন্ত ভাণ্ডার

  • সামাজিক সমন্বয় ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র

গোপাল-পরম্পরা, বৈষ্ণব দর্শন, সঙ্গীত, এবং সম্প্রদায়-আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে এই শ্রীপাট দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ধর্ম-ইতিহাসে একটি বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে।

মহেশপুরে বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব:

পণ্ডিত লালমোহন বিদ্যানিধি

বাঙালি মনীষার ইতিহাসে যে কজন পণ্ডিত তাঁদের পাণ্ডিত্য ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করেছেন, পণ্ডিত লালমোহন বিদ্যানিধি তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং নিষ্ঠাবান গবেষক।পণ্ডিত লালমোহন বিদ্যানিধি তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার মহেশপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তাঁর পারিবারিক নাম ছিল রমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। পরবর্তীতে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং শিক্ষাভাবনার মাধ্যমে তিনি 'লালমোহন বিদ্যানিধি' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন।লালমোহন বিদ্যানিধির জ্ঞানসাধনার হাতেখড়ি হয়েছিল সংস্কৃত শিক্ষার গভীর পাঠশালায়। তাঁর অসাধারণ মেধা ও সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তির স্বীকৃতি স্বরূপ ১৮৬৮ সালে কলকাতা সংস্কৃত কলেজ তাঁকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘বিদ্যানিধি’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই উপাধিটি কেবল তাঁর নামের অংশ ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর প্রজ্ঞার এক অনন্য স্বীকৃতি।শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রখর সমাজ-গবেষক। বাঙালি সমাজের কুলীন প্রথা, বংশলতিকা এবং আত্মীয়তার বন্ধন নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল অসামান্য। তাঁর পাণ্ডিত্য কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজ কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণে। তাঁর রচিত 'সম্বন্ধনির্ণয়' গ্রন্থটি আজও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

জয় গোপাল তর্কালঙ্কার

বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে জয় গোপাল তর্কালঙ্কার (১৭৭৫–১৮৪৪) ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। নদীয়া জেলার (বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার মহেশপুর) অন্তর্গত বজরাপুর গ্রামে ১৭৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করা এই পণ্ডিতের জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও বাংলা ভাষার উন্মোচনে নিবেদিত। তার পিতা কেবলরাম ভট্টাচার্য তর্কপঞ্চানন ছিলেন নাটোররাজের সভাসদ।

প্রাথমিক জীবন থেকে জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার মধ্যে। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বৃদ্ধ পিতা কেবলরাম যখন তাকে সঙ্গে নিয়ে কাশীবাসী হন, সেখানেই তিনি গভীর শিক্ষা লাভ করেন এবং সাহিত্যশাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তার সমসাময়িককালে তার তুল্য শাব্দিক বা ভাষাবিদ খুব কমই দেখা যেত।

জীবনের এক পর্যায়ে সাংসারিক সংকটে পড়লেও, তার মেধা ও অধ্যবসায় তাকে সঠিক পথে চালিত করে। ত্রিশ বছর বয়ঃক্রমকালে ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শ্রীরামপুরের উইলিয়াম কেরির অধীনে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৮১৩ সালে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজের সাহিত্য অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি বহু কৃতী ছাত্রের জন্ম দেন, যাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তারাশঙ্কর ও মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মতো দিকপালরা ছিলেন। তিনি তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের জজ পণ্ডিতদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন। কেবল তাই নয়, কেরি ও মার্শম্যানের মতো সাহেবরাও তার কাছে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন।

জয় গোপাল তর্কালঙ্কারের প্রধান এবং যুগান্তকারী অবদান হলো বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে। শ্রীরামপুরে যখন বাংলা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়, তখন তিনিই সর্বপ্রথম কৃত্তিবাসের রামায়ণ এবং কাশীদাসের মহাভারত পরিশোধিত করে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত বাংলা ভাষার বর্তমান উন্নতির সূত্রপাত করেন। যদিও এই গ্রন্থগুলোর পাঠ বিকৃত করার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন, তবে বাংলা ভাষায় প্রাচীনতম সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি তিনিই প্রথম করেছিলেন।

রামায়ণ ও মহাভারত ছাড়াও, তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে বিশ্বমঙ্গলের হরিভক্ত্যাত্মিকা সংস্কৃত কবিতাগুলির বঙ্গানুবাদ এবং 'পারসী অভিধান' নামে একটি অভিধান। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক ও সুকবি।

১৮৪৪ সালে এই মহান পণ্ডিত লোকান্তরিত হন। তার কর্ম এবং শিক্ষা আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক নতুন পথের দিশা দিয়েছিল।


তথ্যসূত্র: নির্মল কুমার মুখোপাধ্যায় (ইতিহাসের বনগ্রাম)

              সতীশচন্দ্র মিত্র (যশোহর-খুলনার ইতিহাস )

              শ্রীহরিদাস দাস(শ্রীশ্রী গৌড়ীয় বৈষ্ণব তীর্থ বা শ্রীপাঠ বিবরণী)

শ্রীকুমুদনাথ মল্লিক(নদীরা-কাহিনী)


Friday, November 14, 2025

Sree Sundarananda Thakur (শ্রী সুন্দরানন্দ ঠাকুর)

Sree Sundarananda Thakur (শ্রী সুন্দরানন্দ ঠাকুর)


চৈতন্য যুগে তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর অন্তরঙ্গ সঙ্গী হিসেবে আবির্ভূত হন। চৈতন্য চরিতামৃতচৈতন্য ভাগবত—উভয় গ্রন্থেই তাঁর ভক্তি, অনন্য সেবাভাব ও অলৌকিক কীর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।  ভক্তি ও সাধনায় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করেছিলেন। তাঁর জীবনের বিশেষ দিক হলো—তিনি কখনো বিবাহ করেননি। তাই তাঁর নিজের কোনো বংশধর নেই। 

শ্রীবৃন্দাবন-লীলায় শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সঙ্গী ও সহচরগণ ‘গোপাল’ নামে পরিচিত।
এই গোপালরা শুধু সাধারণ বন্ধু নন; তারা শ্রীকৃষ্ণের দৈনন্দিন লীলা, ক্রীড়া, অবসরের হাসি-আনন্দ থেকে শুরু করে বিপদ-কঠিন সময়ে সঙ্গদান—প্রত্যেক ক্ষেত্রে অবিচ্ছেদ্য সাথী। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে, এই সখাগণ ভক্তিভাবের স্বরূপ অনুযায়ী মোট চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত।

১. সুহৃত্

সুহৃত্-শ্রেণীর সখারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর স্নেহে আবদ্ধ। তাঁদের সেবা-ভাব মূলত বন্ধুত্বের সঙ্গে স্নেহ ও মমতার সমন্বয়। তাঁরা কৃষ্ণের কল্যাণকে সর্বাগ্রে রাখেন এবং তাঁর যেকোনো প্রয়োজন বা সংকটে ছুটে আসেন।

২. সখা

সখারা শ্রীকৃষ্ণের সাধারণ বন্ধুবৃত্ত। তাঁরা কৃষ্ণের সঙ্গে খেলাধুলা, গোপন হাসিঠাট্টা, বনভ্রমণ, গোঁফে দই লাগানো ইত্যাদি নানা লীলায় সমভাবে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে সমান বয়সের সহজ ও নির্ভার বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রবল।

৩. প্রিয়সখা

প্রিয়সখারা কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত গভীর এবং প্রগাঢ় স্নেহে আবদ্ধ। তাঁদের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক আরও আন্তরিক। তাঁরা কৃষ্ণের ব্যক্তিগত অভিরুচি, স্বভাব, শখ—এসব বিষয়ে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে অবগত। কৃষ্ণের আনন্দ-বেদনা তাঁদের নিজের বলে মনে হয়।

৪. নর্মসখা

নর্মসখারা কৃষ্ণের সঙ্গে নিত্য হাস্য-পরিহাস, রসাল আলাপ ও নানান নর্মকৌতুকে মেতে থাকেন। তাঁরা কৃষ্ণকে হাসাতে, আনন্দ দিতে এবং পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের উপস্থিতিতে কৃষ্ণের লীলা হয়ে ওঠে আরও রসপূর্ণ, আরও উজ্জ্বল।

এই চার শ্রেণীর গোপালরা মিলে শ্রীকৃষ্ণের ব্রজ-লীলা জগৎকে করে তুলেছেন অপরূপ, প্রাণবন্ত ও চিরস্মরণীয়।

প্রিয়সখা : শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সমবয়সী সখাগণের পরিচয়

বৃন্দাবনের অসীম লীলামাধুর্যের মধ্যে অন্যতম হলো শ্রীকৃষ্ণের সখাদের সঙ্গে তাঁর সখ্য-সম্পর্ক। এই সখাগণ চার শ্রেণীতে বিভক্ত—সুহৃত, সখা, প্রিয়সখা, নর্মসখা। এর মধ্যে প্রিয়সখা হলেন সেই সব সখা যারা কৃষ্ণের সঙ্গে বয়সে সমান এবং যাঁদের সম্পর্কের মূল ভিত্তি কেবল মাত্র খাঁটি রসপূর্ণ বন্ধুত্ব

শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
“বরস্তুল্যাঃ প্রিয়সখাঃ সখ্যং কেবলমাশ্রিতাঃ।”
অর্থাৎ, যারা কৃষ্ণের সমবয়সী এবং কেবল সখ্য বা বন্ধুত্বের রসকে আশ্রয় করে আছেন—তাঁরাই প্রিয়সখা।

প্রিয়সখাদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ক সম্পূর্ণ অচঞ্চল, নির্মল এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তারা কৃষ্ণের সঙ্গে খেলাধুলা করে, কৌতুক করে, মাঝে মাঝে রাগারাগিও করে—আবার মুহূর্তেই হেসে ওঠে। এই বন্ধুত্বের বন্ধন মোহ, ভয় বা লজ্জা ছাড়িয়ে, হৃদয়ের খোলামেলা ভালবাসায় ভরপুর।

প্রিয়সখাদের ভূমিকায় যে বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া যায়

তাঁরা কৃষ্ণের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের প্রতিটি মুহূর্তে সহচর।কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে তাঁদের খেলাধুলা, পথচলা, বনবিহার—সবই নিখাদ বন্ধুত্বের প্রকাশ।কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলার গাম্ভীর্য তাঁদের স্পর্শ করে না। এই সহজ-সরলতা সম্পর্কটিকে আরও প্রীতিময় করেছে।কৃষ্ণ যখন বাঁশি বাজান, তাঁরা প্রথমেই ছুটে যান তাঁর কাছে।বৃন্দাবনের বনে বনে তাঁদের হাসি-কোলাহলে লীলাভূমি মুখর হয়ে ওঠে।

প্রিয়সখাদের নাম

প্রিয়সখা শ্রেণীর প্রধান সখাগণ হলেন—

স্তোককৃষ্ণ,কিঙ্কিণী,সুদাম,অংশু,ভদ্রসেন,বসুদাম,দাম,বিলাসী,বিটঙ্ক,কলবিঙ্ক,পুণ্ডরীক,সুদামাদি এবং শ্রীদাম (এই শ্রেণীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সখা)

এই সখাগণ বৃন্দাবনের সখ্যরসকে জীবন্ত করে তুলেছেন। কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত এক অনির্বচনীয় মাধুর্যে অলোকিত।

নিত্যানন্দ প্রভুর উপলব্ধি:

নিত্যানন্দ প্রভুর গভীর উপলব্ধি ছিল যে সংঘশক্তি ছাড়া কোনো মহৎ ধর্মীয় বা সামাজিক আন্দোলন সফল হতে পারে না। বাংলার মানুষের মধ্যে বৈষ্ণবধর্মের মহিমা ছড়িয়ে দিতে হলে প্রয়োজন ছিল একদল নিবেদিত, শাস্ত্রজ্ঞ, ও প্রেমভক্ত সহচরের। এই কারণেই তিনি তাঁর সমপ্রাণ, সমব্যথী ও নিত্যসঙ্গী ১২ জন পণ্ডিত ভক্তকে একত্র করে তাঁদের বিশেষভাবে “গোপাল” উপাধি প্রদান করেন।

এই দ্বাদশ ভক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দ্বাদশ গোপাল তত্ত্ব, যা বৈষ্ণবধর্মীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ধর্মপ্রচার, নামসংকীর্তন, অসহায়দের সেবা, এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব প্রদান করা হয় তাঁদের। তাঁদের দ্বারা পরিচালিত এই আধ্যাত্মিক আন্দোলন শুধু ধর্মীয় জাগরণই আনেনি, বরং বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করেছিল।

নিত্যানন্দ প্রভুর এই সংগঠিত প্রয়াসের ফলেই বৈষ্ণবধর্ম বাংলার গৃহে গৃহে, জনপদে জনপদে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। দ্বাদশ গোপাল তাই শুধু ভক্ত নয়—
তাঁরা ছিলেন আন্দোলনের বাহক, প্রচারের অগ্রদূত এবং বৈষ্ণব ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

নিত্যানন্দ প্রভুর দ্বাদশ গোপাল নির্বাচন:

বাংলায় বৈষ্ণবধর্মের বিস্তারে নিত্যানন্দ প্রভু শুধু একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক ভাবনা, সামাজিক সমতা ও সংগঠিত শক্তির এক অগ্রগামী প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রচারকাজ ছিল যুগান্তকারী, কারণ এতে ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের গভীর বার্তাও নিহিত ছিল।

১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে পানিহাটি চিঁড়ে-দৈ মহোৎসব ছিল সেই সামাজিক বিপ্লবের সূচনা। জাতিভেদের কঠোর বেড়া ভাঙতে তিনি একসঙ্গে ৩৬ জাতিকে বসিয়ে ভোজন করিয়েছিলেন। বাংলায় জাতিভেদ বিলোপের এটি ছিল প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী গণঘোষণা—যেখানে খাদ্যের মাধ্যমে সমতার ধর্মীয় রীতি প্রতিষ্ঠা পায়। আজও বাংলার বহু স্থানে কীর্তন শেষে এক পংক্তিতে বসে মহোৎসবের খিচুড়ি ভোজন তারই ধারাবাহিক রীতি। তাই ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের উক্তি—
“নিত্যানন্দ বঙ্গের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রবাদী।”
—একেবারে যথার্থ।

বৃহৎ কাজ সম্পন্নের জন্য যে সংঘশক্তি প্রয়োজন, তা নিত্যানন্দ প্রভু গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এই কারণেই পানিহাটির গঙ্গাতীরে চিঁড়ে-দৈ মহোৎসবের সময়েই তিনি “দ্বাদশ গোপাল” নির্বাচন করে বাংলার বিভিন্ন জনপদে শ্রীপাট স্থাপনের দায়িত্ব প্রদান করেন। গোপাল শব্দের অর্থ—কৃষ্ণের রাখাল বন্ধু, অর্থাৎ বিশ্বস্ত, নিকটতম সঙ্গী।


শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুরের পরিচয়:


শ্রী  সুন্দরানন্দ ঠাকুর পূর্বজন্মে বারোজন গোপালের একজন ছিলেন, যার নাম ছিল সুধামা। সুন্দরানন্দ ঠাকুর ছিলেন ব্রজের সুদাম সখার অবতার। তিনি তেজস্বী ও দিব্যদেহধারী মহাপুরুষ হিসেবে সুপরিচিত। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন গভীরভাবে তীর্থানুরাগী এবং বিভিন্ন তীর্থে ভ্রমণ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিযুক্ত হতেন। তাঁর জন্মভূমি যশোহর জেলার হলদা মহেশপুর গ্রাম


সুন্দরানন্দ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ বর্তমান অবস্থান: 

তাঁর কিছু আত্মীয়ের বংশধর এখনও বীরভূম জেলার মঙ্গলডিহিতে বসবাস করছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।তাঁর ব্যক্তিগত পূজিত দেবতা রাধা-কালাচাঁদজি বর্তমানে বৃন্দাবনের রাধা-গোবিন্দ মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন। এছাড়া তাঁর সমাধি আজও অবস্থিত বিখ্যাত “চৌষট্টি সমাধি” প্রাঙ্গণে, যা ভক্তদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে সম্মানিত। 

তিনি ছিলেন একজন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, অর্থাৎ আজীবন অবিবাহিত।তৎকালীন যশোর জেলার মহেশপুর  তিনি রাধা-বল্লভের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ব্রজলীলায় তিনি সুধামা নামে পরিচিত ছিলেন—বারোজন গোপালের একজন। 

বর্তমানে মহেশপুরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ ও শ্রীশ্রীরাধারমণের সেবা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই পবিত্র স্থানটি আজও ভক্তসমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। 


সুন্দরানন্দ ঠাকুরের সেবায়ীত ও রাধারামণের স্থানান্তর: 

সুন্দরানন্দ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শ্রদ্ধেয় শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ বিগ্রহ এক সময় মহেশপুরে বিরাজমান ছিলেন। তবে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়, সৈদাবাদের গোস্বামীরা তাঁকে চুরি করে সইদাবাদে নিয়ে যান। এই ঘটনায় ভক্তসমাজ গভীর বেদনায় নিমজ্জিত হয়।পরবর্তীকালে, ভক্তদের প্রতি করুণাবশত স্বয়ং দেবতার স্বপ্নাদেশে দারুময় (কাঠের) একটি নতুন বিগ্রহ মহেশপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দারুময় বিগ্রহই বর্তমানে শ্রীশ্রীরাধাবল্লভরূপে পূজিত হচ্ছেন।বর্তমানে মহেশপুরের জমিদার মহাশয়গণ এই বিগ্রহের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে দৈনন্দিন পূজা-অর্চনা, উৎসব এবং ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।প্রতি বছর মহেশপুরে মাঘী পূর্ণিমার দিনে সুন্দরানন্দ ঠাকুরের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ উৎসব আয়োজিত হয়। ভক্তদের সমাগমে মহেশপুরের পরিবেশ ভক্তিসুধায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, এবং সুন্দরানন্দ ঠাকুরের স্মৃতি সেখানে চিরজাগরূক থাকে।

শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর সাথে তার সখ্যতা:

ইনি ছিলেন এক মহাপ্রেমিক ভক্ত—অতুলনীয় ভক্তিভাব, নিবেদন ও প্রেমোচ্ছ্বাসে যাঁর হৃদয় সদা ভরপুর থাকত। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর অতিগুরুত্বপূর্ণ পারিষদগণের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান। নিত্যানন্দ প্রভুর অন্তরঙ্গ সহযোগী ও সেবাসঙ্গী হিসেবে তাঁর স্থান ছিল বিশেষভাবে সম্মানিত। ভক্তি, দয়া, হৃদয়ের সরলতা এবং আধ্যাত্মিক শক্তিতে তিনি সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

অলৌকিক কীর্তি: 

“শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুর পানির ভিতরে কুন্ডীর ধরিয়া আনে সভায় গোচরে।”

এর মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর অসীম সাহস, অলৌকিক ক্ষমতা এবং প্রভুভক্তিতে মগ্ন হৃদয়ের পরিচয়। বলা হয়, প্রেমোচ্ছ্বাসে তিনি যখন সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে যেতেন, তখন জলে নিমজ্জিত হয়ে নিজ হাতে কুমির ধরে সভায় নিয়ে আসতেন। উপস্থিত ভক্তেরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতেন তাঁর এই অতিমানবীয় ক্ষমতা দেখে।

তাঁর অলৌকিকতার আরেক অনন্য নিদর্শন হলো—জাম্বীর (লেবু) গাছে কদম্ব ফুল ফোটানো।
স্বাভাবিক নিয়মে যেখানে কদম্ব গাছে এই ফুল ফোটে, সেখানে লেবু গাছে কদম্ব ফুটানো কেবলই ঈশ্বরপ্রদত্ত শক্তি ও গভীর ভক্তিবলে সম্ভব। সুন্দরানন্দ ঠাকুর সেই বিরল সাধকদের অন্তর্গত, যাঁদের হৃদয়ের প্রেমানুভূতি প্রকৃতির নিয়মকেও বাঁকিয়ে দিতে সক্ষম।

এইসব অলৌকিক ঘটনাই প্রমাণ করে যে সুন্দরানন্দ ঠাকুর ছিলেন শুধু একজন ভক্ত নন, বরং নিত্যানন্দ প্রভুর অন্তরঙ্গ সঙ্গী, দিব্যশক্তি-সমৃদ্ধ আত্মা এবং পতিতপাবন নিত্যানন্দের করুণা-রূপের প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনকথা ভক্তদের মনে আজও বিস্ময়, শ্রদ্ধা ও গভীর বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।

বনের প্রচণ্ড হিংস্র ব্যাঘ্রকেও তিনি নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি ও দয়ার প্রভাবে বশমান করতে পারতেন। গভীর অরণ্য থেকে সেই বাঘ ধরে এনে তাঁর কানে সস্নেহে হরিনাম শোনাতেন। যে পশু স্বভাবতই ভয়ংকর ও অপ্রশমিত—তার হৃদয়েও তিনি ভক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হতেন। তাঁর এই অপূর্ব লীলার মধ্যেই প্রকাশ পায় তাঁর অসীম করুণা, অলৌকিক শক্তি এবং সকল জীবের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি।


তার আবির্ভাবকাল সম্পর্কে:

শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুরের আবির্ভাবকাল সম্পর্কে শাস্ত্রীয় ও প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে তাঁর জন্ম ১৪০০ শত শকাব্দের কিছু পূর্বে। জন্ম থেকেই তিনি অতুলনীয় ভক্তিভাব ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে তাঁকে নিত্যানন্দ প্রভুর অতি অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে প্রধান আসনে প্রতিষ্ঠা করে।তাঁর জীবনযাত্রা ও লীলার শেষ পর্যায়ের সময়কালও ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, তাঁর তিরোভাব হয় ১৪০০ শত শকাব্দের শেষ ভাগে—যখন বৈষ্ণবধর্মের প্রচার ও গৌড়ীয় আন্দোলনের উন্মেষ তুঙ্গে।পুরীধাম হইতে আগমন করে তিনি ১৪৩৯ শকে পানিহাটীর দণ্ডমহোৎসবে উপস্থিত ছিলেন। সেই মহোৎসবে তাঁর উপস্থিতি কীর্তন ও ভক্তসমাজে নতুন আনন্দের সঞ্চার করে। নিত্যানন্দ প্রভুর সান্নিধ্যে তিনি সেখানে বিশেষভাবে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।তবে ১৫০৪ শকাব্দে খেতুরীর মহোৎসব—যা ইতিহাসে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের অন্যতম প্রধান সম্মেলন—সেখানে তাঁকে দেখা যায় না। গবেষকদের মতে, এই সময়ের পূর্বেই তাঁর তিরোভাব ঘটেছিল বলে অনুমান করা হয়।


শ্রীসুন্দরানন্দ-প্রসঙ্গ;-

সুন্দরানন্দ–নিত্যানন্দের শাখা ভৃত্য মর্ম।
যাঁর সঙ্গে নিত্যানন্দ করে ব্রজনর্ম।।
—(চৈঃ চঃ আঃ-১১।২৩)
শ্রীমদ্ কবিকর্ণপুর গোস্বামী লিখেছেন—
“পুরা সুদাম—নামাসীদ্ অদ্য ঠকুর সুন্দরঃ।”
—(গৌর গণোদ্দেশ দীপিকা )
—(চৈঃ চঃ আদি ১১ পরিঃ ২৩ শ্লোক অনুভাষ্য)
প্রেমরস-সমুদ্র-সুন্দরানন্দ নাম।
নিত্যানন্দস্বরূপের পার্ষদ প্রধান।।
~(চৈঃ ভাঃ অঃ – ৫।৭২৮)
কার্ত্তিক পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুর অপ্রকট লীলা করেন।

বৈষ্ণব গ্রন্থে শ্রীসুন্দরানন্দ-প্রসঙ্গ;-
(ক) অনন্তসংহিতায়; সুদামনাম গোপাল শ্রীমান্ সুন্দরঠক্ক রঃ (খ) গৌরগণোদেশ,- পুরা সুদামনামাসীদন্য ঠক বসুন্দরঃ। (১২৭) (গ) ভক্তমালে,- সুন্দর ঠাকুর যেহ তেঁহ শ্রীসুদাম। (ঘ) বৈষ্ণব আচারদর্পণে (১ম, ৩৩২ পৃঃ);- সুদাম গোপাল পূর্ব্বে কৃষ্ণসথা রঙ্গী। সুন্দরানন্দ ঠাকুর এবে চৈতন্যের সঙ্গী ॥ বাল্যকালাবধি তীর্থভ্রমণ প্রচুর। নিত্যানন্দ-শাখা বাস হয় মহেশপুর
(ঙ) পাটপর্য্যটনে;- হলদা মহেশপুরে সুন্দরানন্দের বাস। সুন্দরানন্দ পূর্ব্বে সুদাম জাদিবা নিৰ্যাস ॥ (চ) নীলাচল দাসের ১২শ পাটনির্ণয়ে;- ঠাকুর সুন্দরানন্দ হলদা মহেশপুর।
(ছ) শ্রীচৈতন্যসঙ্গীতায়,- শ্রীসুদাম সুন্দরানন্দ নামেতে প্রকাশ। হলদা মহেশপুরে করিলেন বাস॥ (জ) বৈষ্ণববন্দনা। বৃন্দাবন্দাস ঠাকুরের কৃত,- প্রেমের সমুদ্র ভেল শ্রীসুন্দরানন্দ নাম। নিত্যানন্দ স্বরূপের মহা প্রেমধাম ৷ পারিষদ মধ্যে যাঁর প্রথমে গণনা। নিত্যানন্দ স্বরূপের ধন প্রাণ বানা ॥ ১ সুদাম করিয়া যাঁরে পুরাণে বাখানে। সুন্দরানন্দ সেই বস্তু জানে সর্ব্ব জনে॥ (ঝ) বৈষ্ণববন্দনা, দৈবকীনন্দনকৃত,- সুন্দরানন্দ ঠাকুর বন্দিব বড় আশে। ফুটাল কদম্ব ফুল জম্বীরের গাছে।
(ঞ) বৈষ্ণববন্দনা, বৃন্দাবন দাসকৃত,- ব্রজের সুদাম বন্দো ঠাকুর সুন্দর। অগ্নি সম তেজ যাঁর মূর্ত্তি মনোহর। যাঁর দাসে ধরিয়া বনের ব্র্যাঘ্র আনে। কোল দিয়া হরিনাম শুনায় তার কাণে (ট) বৈষ্ণব অভিধানেও সুন্দরানন্দের নাম আছে। (১) শ্রীচৈতন্যভাগবতে (অন্ত্য, ৬। ৪৭৪ পৃঃ ),-
প্রেমরসসমুদ্র সুন্দরানন্দ নাম। নিত্যানন্দ স্বরূপের পার্ষদ প্রধান।
(ড) শ্রীচরিতামৃতে (আদি, ১১ অঃ। ১০২ পৃঃ) - সুন্দরানন্দ নিত্যানন্দের শাখা ভূতামৰ্ম্ম। যাঁর সনে নিত্যানন্দ করে ব্রজমৰ্ম্ম॥ (ঢ) জয়ানন্দের শ্রীচৈতন্যমঙ্গলে,- শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুর পানির ভিতরে। কুন্ডীর ধরিয়া আনে সভায় গোচরে।


স্থান-পরিচয়:

সুন্দরানন্দ ঠাকুরের জন্মস্থান ছিল তৎকালীন যশোহর জেলার মহেশপুর গ্রাম বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার মহেশপুর উপজেলা বণিকপাড়ায় অবস্থিত  । গ্রামটি বেত্রাবতী নদীর তীরে অবস্থিত। 

মহেশপুর গ্রামটি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের মাজিদিয়া স্টেশন থেকে প্রায় চৌদ্দ মাইল দূরে অবস্থিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই স্টেশনের নাম পূর্বে ছিল শিব’নবাস। পরবর্তীকালে এর নামকরণ হয় মাজিদিয়া।




তথ্যসূত্র: শ্রীশ্রীদ্বাদশ গোপাল বা শ্রীপাটের ইতিবৃৃত্ত (শ্রীঅমূল্যধন রায় ভট্ট)

“শ্রী চৈতন্য: হিজ লাইফ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস” — শ্রীল ভক্তিবল্লভ তীর্থ মহারাজ

Sunday, October 5, 2025

কবিতা শারদ অর্ঘ্য

 

শারদ অর্ঘ্য
-শুভ জিত দত্ত
ভোরের আকাশ শুভ্র মেঘের আড়ালে
থেকে বাহারি রঙের মেলা।
শরৎ আকাশ জুড়ে আনাগোনা বাড়ে
স্নিগ্ধ সাদা মেঘের দলের।
সাদা শাড়ির ভাঁজে লাল পেড়ে আঁচল
দিগন্তের পরশ বুলিয়ে
কাশফুলের রাজ্যে জুড়ে এই বোধ হয়
তোমার আনা গোনা।
শারদ অর্ঘ্য নিবেদনে বছরের অপেক্ষায়
তোমার সাথে হবে দেখা ।
কথা হবে,আর আড্ডার ফাঁকে ঘোরাঘুরি
তার সঙ্গে জমবে পেট পূজা।
সেই সঙ্গে না বলা কথা এই পূজা তে
যেভাবে হোক বলে ফেলা
ষষ্ঠী থেকে দশমী পূজা প্রেমের গল্প
কবিতায় কাটুক সারা বেলা।।

Monday, September 29, 2025

উৎসবের মেজাজ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা

 

উৎসবের মেজাজ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা











উৎসবের মেজাজ

শুভ জিত দত্ত
শরৎ আকাশ জুড়ে সময়ে-অসময়ে
সাদা মেঘের দলের আনাগোনা।
কখনো ভীষণ ভিড় জমিয়ে কোলাহলে
মেতে উঠে কখন বা ছন্নছাড়া।
তার মাঝে দিগন্তজোড়া কাশফুলে
বাতাসের ঢেউ খেলে যায়।
শিউলি ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে
প্রকৃতির আনাচে-কানাচে।
দেখতে দেখতে উৎসব-আমেজ ছড়িয়ে
যায় শহর-গ্রামের প্রান্তরে।
চিরচেনা সুরে মন মাতোয়ারা আজ,
বেঁধে রাখে কে আমারে!
বাঁধনহারা দিকভ্রান্ত হয়ে নিজেকে
খুঁজে ফেরে নতুন করে।
আড্ডা, গান আর ঘোরাঘুরি চলছেই
সকাল থেকে রাত অবধি।

Saturday, September 27, 2025

বিবর্ণ শরৎ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা

বিবর্ণ শরৎ | শারদীয় দুর্গা পূজা নিয়ে কবিতা

বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হলো শারদীয় দুর্গা পূজা। এ সময় শরতের আকাশ ভরে ওঠে শিউলির সুগন্ধে, ঢাকের বাজনায় মুখরিত হয় প্রতিটি পূজামণ্ডপ। সেই আনন্দঘন উৎসবের আবহকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে কবিতা “বিবর্ণ শরৎ”

এই কবিতায় যেমন রয়েছে দুর্গোৎসবের আনন্দ, তেমনি রয়েছে বিদায়ের বেদনা। কারণ দেবী দুর্গার আগমন মানেই উৎসব, আর বিদায় মানেই বিষণ্নতা। শরতের সাদা মেঘ আর শিউলি ফুলের সুবাসে ভরা সময়ে, কবিতাটি পাঠকের মনে ছুঁয়ে যায় গভীর আবেগ।



বিবর্ণ শরৎ

-শুভ জিত দত্ত


শরৎ এর সকাল উঠান জুড়ে ছড়িয়ে থাকা
শিউলি ফুলের একরাশ স্নিগ্ধতা
দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলেই দিগন্ত জোড়া
কাশফুলের রাজ্যে জুড়ে ঢেউ খেলে।

নীল আকাশে সাদা মেঘের দল ভীর জমিয়ে
এক অদ্ভুত আলপনা এঁকে যাই
সন্ধ্যার আগ মুহুর্ত অবধি চলে তাদের এই
আঁকিবুঁকি খেলায় মেতে থাকা।

এবছর যেন তার ঠিক ব্যতিক্রম শরৎ আকাশে
সাদা মেঘ ম্লান হয়েছে কালো মেঘে।
সময়ে অসময়ে ঘনিয়ে আসে কালো মেঘ আর
অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে যায় ।

শরৎ এর সেই চিরচেনা আমেজ ফিকে
হয়েছে মেঘ বৃষ্টির দখলে গিয়ে।
আবার নীলাভ শুভ্র আকাশের বুকে ভীর
জমাক স্নিগ্ধ সাদা মেঘের দল।। 

Saturday, August 23, 2025

Google I/O 2025: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত


 

Google I/O 2025: প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত

প্রতিবারের মতো এ বছরও Google I/O সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য হাজির হয়েছে যুগান্তকারী সব ঘোষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গুগল তাদের সেবাকে আরও উন্নত ও ব্যবহারবান্ধব করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত ফিচারগুলো—

 Google Meet: ভাষা পেরিয়ে কথা বলার নতুন অভিজ্ঞতা

এখন থেকে অনলাইনে মিটিং করার সময় ভাষার বাধা আর থাকছে না। Google Meet–এ যুক্ত হয়েছে রিয়েল-টাইম ট্রান্সলেশন ফিচার, যেখানে একজন বাংলা ভাষায় কথা বললে অপর প্রান্তের মানুষ ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষায় শুনতে পাবেন। শুধু অনুবাদ নয়, বরং বক্তার স্বর ও টোনও সংরক্ষিত থাকবে। ফলে যোগাযোগ হবে আরও স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত।

Veo 3: সিনেমার মতো ভিডিও বানাবে AI

গুগল উন্মোচন করেছে Veo 3, তাদের সর্বশেষ ভিডিও জেনারেশন মডেল। এটি শুধু টেক্সট থেকে ভিডিও তৈরি করে না, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাউন্ড, ইফেক্ট, এমনকি ডায়লগও জেনারেট করতে পারে। ব্যবহারকারীরা একটি ছবি দিয়েই ছোট ভিডিও বানাতে পারবেন। এক কথায়, সিনেমা নির্মাণের জটিল কাজ এখন অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

Google AI Ultra: প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান

উন্নত সুবিধা পেতে চাইলে ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে Google AI Ultra সাবস্ক্রিপশন। মাসিক নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এটি ব্যবহার করে পাওয়া যাবে Veo 3, Flow, Deep Think মডেলসহ নানা প্রিমিয়াম ফিচার। সিনেমার VFX, ভিডিও, সাউন্ড—সবকিছু তৈরি করার ক্ষমতা এই প্ল্যানে উন্মুক্ত।

Gemini স্মার্ট চশমা: বাস্তবেই ভবিষ্যতের পথে

সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘোষণার একটি হলো Gemini Smart Glasses (Android XR)। এই স্মার্ট চশমার মাধ্যমে—

  • নোটিফিকেশন পড়া ও শোনানো

  • রিয়েল-টাইম অনুবাদ

  • নেভিগেশন গাইড

  • আশপাশের তথ্য জানার সুবিধা

সবই পাওয়া যাবে। সহজভাবে বললে, এটি যেন চোখের সামনে আরেকটি Google Assistant!

 Deep Think: জটিল প্রশ্নের সমাধান

গুগল তাদের নতুন AI মডেল Deep Think ঘোষণা করেছে, যা Ultra সাবস্ক্রিপশনের অংশ।

  • এটি ধাপে ধাপে চিন্তা করে জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।

  • শিক্ষা, গবেষণা বা ব্যবসায়িক বিশ্লেষণে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

Google I/O 2025 দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিচ্ছে। যোগাযোগ থেকে শুরু করে সিনেমা নির্মাণ কিংবা ভ্রমণের পথে সহায়ক তথ্য পাওয়া—সবকিছুই এখন আরও সহজ, দ্রুত ও আকর্ষণীয়। প্রযুক্তি যে ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, Google-এর এই ঘোষণাগুলোই তার প্রমাণ।


Thursday, August 7, 2025

রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ

 রামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ



১৮৮৩ সালের ২রা মে, চৈত্র কৃষ্ণাদশমী তিথিতে সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—দুই মহান আত্মার, শ্রীমৎ রামকৃষ্ণদেব ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র সাক্ষাৎ। স্থান ছিল উত্তর কলকাতার প্রফুল্ল স্ট্রিটের ২৩৪ নম্বর বাড়ি, যেটি ‘নন্দনবাগান’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে ব্রাহ্মসমাজের বিংশ সাংবাৎসরিক উৎসব উদযাপন চলছিল। এই উপলক্ষে ঠাকুর উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁর ভক্তদের—বিশেষত রাখাল মহারাজ (পরবর্তীতে স্বামী ব্রহ্মানন্দ)—সহ।


দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল পাঁচটা নাগাদ কাশীশ্বর মিত্রের বাড়ির সবচেয়ে বড় কক্ষে আয়োজিত হয় এক বিশেষ সভা। সভা শুরু হয় এক অনন্য শিল্পানুষ্ঠানে—ঠাকুর রামকৃষ্ণের অনুরোধে যুবক রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো বাজিয়ে পরিবেশন করেন নিজের লেখা ব্রহ্মসংগীত “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তরে।” এই গানটি যেন শুধু রামকৃষ্ণদেবের জন্যই লেখা হয়েছিল—তেমনই এক আত্মিক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।


গানটির ভেতরে ছিল গভীর আত্মসমর্পণের আহ্বান, যা শুনে শ্রীমৎ ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন—চোখে জল, হৃদয়ে ভক্তির উথান। আর সেই দৃশ্য দেখে ২২ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথও বিমুগ্ধ হয়ে যান। দুই মহান ব্যক্তিত্বের মধ্যে কোনো কথোপকথনের দীর্ঘ বিবরণ নেই, কিন্তু তাঁদের ভেতরকার অনুভব ও মানসিক যোগাযোগ ছিল অনির্বচনীয়।


সভা শেষে ঠাকুর সকলের সঙ্গে বসে লুচি, ডাল, তরকারি ও মিষ্টি খান এবং আনন্দঘন পরিবেশে বিদায় জানিয়ে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যান।


এই একটি মাত্র সাক্ষাৎ যদিও সংক্ষিপ্ত ছিল, তবে তা দুই মহামানবের অন্তর্জগতের মিলনের এক অনন্য স্মারক হয়ে আছে ইতিহাসে। রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও সুসম্পর্ক ছিল। ব্রাহ্মসমাজ ও রামকৃষ্ণ পরম্পরার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধ, এই সাক্ষাৎ যেন তারই এক শুভ চিহ্ন।

Saturday, July 26, 2025

গুগল জেমিনি: ভবিষ্যৎ আনছে নতুন দিগন্ত!

 

গুগল জেমিনি: ভবিষ্যৎ আনছে নতুন দিগন্ত!

গুগল জেমিনি (Google Gemini) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক নতুন বিপ্লব আনতে চলেছে, যা আমাদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। গুগল তার এই অত্যাধুনিক এআই মডেলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের জন্য কী কী অসাধারণ সুবিধা নিয়ে আসছে, সে সম্পর্কে একটি বিস্তারিত ধারণা নিচে দেওয়া হলো।


১. উন্নত কথোপকথন এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ (NLP)

জেমিনি শুধুমাত্র একটি চ্যাটবট নয়; এটি আপনার সাথে আরও স্বাভাবিক এবং অর্থপূর্ণ কথোপকথন করতে সক্ষম। এটি মানুষের ভাষার সূক্ষ্মতা, আবেগ এবং প্রসঙ্গ বুঝতে পারে, যার ফলে এটি আরও প্রাসঙ্গিক এবং সহায়ক উত্তর দিতে পারে। ভবিষ্যতে এটি আরও জটিল আলোচনা পরিচালনা করতে পারবে, এমনকি আপনার মেজাজ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেবে।


২. মাল্টিমোডাল ক্ষমতা: টেক্সট, ছবি এবং আরও অনেক কিছু!

জেমিনির অন্যতম শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য হলো এর মাল্টিমোডাল ক্ষমতা। এর মানে হলো এটি শুধুমাত্র টেক্সট নয়, ছবি, অডিও এবং ভিডিও ডেটা বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:

  • আপনি একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারবেন, "এই ছবিতে কী আছে?" এবং জেমিনি বিস্তারিত বর্ণনা দেবে।

  • একটি ভিডিওর নির্দিষ্ট অংশ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সেটি বিশ্লেষণ করে উত্তর দিতে পারবে।

  • বিভিন্ন ডেটা ফরম্যাট একত্রিত করে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে।


৩. কোডিং এবং ডেভেলপমেন্টে সহায়তা

প্রোগ্রামারদের জন্য জেমিনি একটি অসাধারণ টুল হতে চলেছে। এটি কোড লিখতে, ডিবাগ করতে এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষার মধ্যে অনুবাদ করতে সাহায্য করবে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের প্রক্রিয়াকে এটি আরও দ্রুত এবং ত্রুটিমুক্ত করবে। ডেভেলপাররা নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে বা বিদ্যমান কোডবেস উন্নত করতে জেমিনির সাহায্য নিতে পারবেন।


৪. শিক্ষা এবং গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন

শিক্ষার্থীরা এবং গবেষকরা জেমিনির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং জটিল বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারবেন। এটি ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা পাবে। গবেষণা কাজে এটি ডেটা বিশ্লেষণ, হাইপোথিসিস তৈরি এবং প্রবন্ধ লেখায় সহায়তা করবে।


৫. দৈনন্দিন কাজকর্মে স্মার্ট সহায়তা

আপনার দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ করতে জেমিনি বিভিন্নভাবে সাহায্য করবে:

  • সময়সূচী ব্যবস্থাপনা: আপনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মিটিং সেট করা বা রিমাইন্ডার দেওয়া।

  • ভ্রমণ পরিকল্পনা: ফ্লাইট, হোটেল এবং কার্যক্রমের পরিকল্পনা তৈরি করা।

  • তথ্য অনুসন্ধান: যেকোনো বিষয়ে দ্রুত এবং নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করা।

  • সৃজনশীল কাজ: গল্প লেখা, কবিতা তৈরি বা নতুন ধারণা তৈরিতে সহায়তা করা।


৬. ব্যক্তিগতকরণ এবং অভিযোজন ক্ষমতা

জেমিনি ব্যবহারকারীর পছন্দ, অভ্যাস এবং অতীত কার্যকলাপ থেকে শিখতে পারে। এর ফলে এটি আরও ব্যক্তিগতকৃত এবং উপযোগী অভিজ্ঞতা প্রদান করতে সক্ষম হবে। সময়ের সাথে সাথে এটি আপনার প্রয়োজনগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী সহায়তা করবে।


৭. নিরাপত্তা এবং নীতিশাস্ত্রের প্রতি জোর

গুগল জেমিনির বিকাশে নিরাপত্তা এবং নৈতিকতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। ভুল তথ্য ছড়ানো বা ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু তৈরি করা থেকে বিরত থাকার জন্য এটি কঠোরভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষা এবং এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গুগল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


৮. রিয়েল-টাইম মাল্টিমোডাল ইন্টারেকশন

জেমিনি কেবল টেক্সট, ছবি বা অডিও বুঝতে পারে না, এটি রিয়েল-টাইমে এই সব তথ্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবে। এর অর্থ হলো, আপনি যখন কথা বলবেন, জেমিনি আপনার মুখের ভাবভঙ্গি, শারীরিক ভাষা এবং পরিবেশের শব্দ বিশ্লেষণ করে আপনার উদ্দেশ্য আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি একটি রেসিপি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন এবং একই সাথে রান্না করার ভিডিও দেখান, জেমিনি উভয় উৎস থেকে তথ্য নিয়ে আপনাকে আরও সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেবে।


৯. অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স এবং ফিজিক্যাল ইন্টারেকশন

গুগল জেমিনিকে শুধুমাত্র ডিজিটাল জগতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। এটি রোবোটিক্সের সাথে একীভূত হয়ে বাস্তব জগতে কাজ করতে সক্ষম হবে। এর মানে হলো, জেমিনি এমন রোবট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে যা জটিল কাজ সম্পাদন করে, যেমন - ঘরে জিনিসপত্র সাজানো, ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা অথবা এমনকি মানববিহীন যানবাহন পরিচালনা করা। এটি কেবল নির্দেশের উপর ভিত্তি করে কাজ করবে না, বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।


১০. ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট

জেমিনি আপনার জন্য একটি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে, যা আপনার বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করবে। এটি আপনার ইমেল, ক্যালেন্ডার এবং অন্যান্য ডিজিটাল টুলগুলির সাথে সংযুক্ত হয়ে আপনার মিটিং শিডিউল করবে, গুরুত্বপূর্ণ ইমেলগুলোর সারাংশ তৈরি করবে এবং আপনার পছন্দ অনুযায়ী তথ্য খুঁজে বের করবে। এই এজেন্ট আপনার ডিজিটাল জীবনকে আরও সুসংগঠিত এবং কার্যকর করে তুলবে।


১১. বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আবিষ্কারে ত্বরণ

জেমিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ডেটা বিশ্লেষণ করতে, হাইপোথিসিস তৈরি করতে এবং নতুন পদার্থের বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হবে। এটি নতুন ওষুধ আবিষ্কার, জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলিং এবং পদার্থ বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি গবেষকদের ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্যাটার্ন শনাক্তকরণে সময় বাঁচিয়ে দেবে, যার ফলে নতুন আবিষ্কারের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে।


১২. সৃজনশীল শিল্পে বিপ্লব

সৃজনশীল ক্ষেত্রের জন্য জেমিনি একটি শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। এটি সঙ্গীত রচনা, চিত্রকর্ম তৈরি, গল্প এবং চিত্রনাট্য লেখায় শিল্পীদের সহায়তা করবে। জেমিনি শিল্পীর স্টাইল বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী নতুন ধারণা বা বিকল্প তৈরি করে দেবে। এটি সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং দ্রুত করবে, যার ফলে নতুন ধরণের শিল্পকর্ম তৈরি হবে।


১৩. উন্নত সাইবার নিরাপত্তা

জেমিনি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি সাইবার হামলা শনাক্ত করতে, হুমকির পূর্বাভাস দিতে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেগুলোকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। জেমিনি নেটওয়ার্ক ট্র্যাফিক বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করবে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করবে, যার ফলে ডেটা এবং সিস্টেমগুলি আরও সুরক্ষিত থাকবে।

Saturday, July 19, 2025

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু অমূল্য গোপাল মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস

 ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু অমূল্য গোপাল মহেশপুরের ফতেপুর গ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস

ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার নিভৃত এক গ্রাম ফতেপুর। একসময় এই গ্রাম ছিল ইতিহাস ও উচ্চশিক্ষার এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ। এখানেই বাস করতেন চ্যাটার্জী পরিবার, যাঁরা ব্রিটিশ আমলে উচ্চশিক্ষিত ও সম্মানীয় পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই পরিবারের এক বিশিষ্ট সন্তান ছিলেন অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায়—একজন খ্যাতিমান ব্যারিস্টার ও কলকাতা জজ কোর্টের বিচারক। তাঁর বাবা গোপাল চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন একজন জজ।


তাঁদের পরিবারের ঐতিহ্য ও প্রজ্ঞার এমন নিদর্শন পাওয়া যায়, যা ফতেপুর গ্রামকে শুধুমাত্র একটি জনপদ নয়, ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে তোলে। অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধু ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নলডাঙ্গার রাজা বাহাদুর প্রমথ ভূষণ দেবদার এবং জয়দিয়ার রাজা সতীশ চন্দ্র রায় বাহাদুর। সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি ভাষায় তাঁর প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিল, যা সে সময়ের শিক্ষিত সমাজে একটি বিরল গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো।

তাঁর কলকাতার বাসস্থান ছিল বালিগঞ্জের ২৩/৩১ গড়িয়ারহাট রোডে, যেখানে বর্তমানে তাঁর বংশধরেরা বসবাস করছেন। ফতেপুর গ্রামে তাঁর ৮৮ শতক জমির উপর নির্মিত হয়েছিল একটি সুরম্য পাকা বাড়ি, যার নির্মাণশৈলী ছিল মুর্শিদাবাদের মোগল প্রভাবিত স্থাপত্যরীতি অনুসরণে। জানা যায়, মুর্শিদাবাদ থেকে রাজমিস্ত্রী এনে নির্মাণ করা হয় এই বাড়ি, যার প্রধান ফটক ও ঠাকুর ঘরের কিছু অংশ এখনও দৃশ্যমান রয়েছে।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় পুরো পরিবার ভারতে চলে যায়। জজ সাহেবের সেই প্রাসাদতুল্য বাড়িটি পরবর্তীতে মৎস্য অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নতুন অফিস গঠনের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং ১৯৯৬ সালে কিছু ভূমিহীন পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে।

এই জমি এবং স্থাপনাটি কেবল একটি বসতভিটা নয়—এটি আমাদের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। অমূল্য গোপাল চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর পারিবারিক অবদানকে সংরক্ষণ করা শুধু অতীতের প্রতি সম্মান নয়, বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক মূল্যবান শিক্ষাও বটে।

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সময়ের দাবি।

Friday, July 18, 2025

প্রকাশিত লেখা কবিতা "মুখোশের আড়ালে"

দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকার সাহিত্য সঞ্চিতা পাতায় প্রকাশিত হলো আমার লেখা কবিতা "মুখোশের আড়ালে"।অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয় সম্পাদক।।

কবিতা পড়তে ক্লিক করুন



Thursday, July 17, 2025

চলিত ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা যশোরের সন্তান প্রমথ চৌধুরী

চলিত ভাষার স্বপ্নদ্রষ্টা  যশোরের সন্তান প্রমথ চৌধুরী

বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে প্রমথ চৌধুরীর নাম এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক বা সম্পাদকই নন, ছিলেন বাংলা গদ্যের এক নির্ভীক সংস্কারক ও নতুন ধারার রূপকার। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান—চলিত রীতির প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা।


বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলা গদ্যভাষা ছিল মূলত সাধু রীতিনির্ভর। এই ভাষা ছিল প্রাঞ্জল ও মার্জিত হলেও সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। সাহিত্যে একধরনের দূরত্ব ও আড়ম্বরিকতা কাজ করত। এই জায়গাতেই বিপ্লব ঘটান প্রমথ চৌধুরী। তিনি উপলব্ধি করেন, সাহিত্যের ভাষা হতে হবে জীবন্ত, স্বাভাবিক ও কথ্য রীতিনির্ভর। সেই ভাবনা থেকেই ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা গদ্যে তিনি নবরীতি প্রবর্তন করেন—যা পরে পরিচিতি পায় ‘চলিত রীতি’ নামে।

১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে জন্ম নেওয়া প্রমথ চৌধুরী ছিলেন পাবনা জেলার চাটমোহরের জমিদার পরিবার পৈতৃকভাবে অভিজাত, আবার মননেও উদার। তাঁর পিতার নাম দুর্গাদাস চৌধুরী এবং মাতার নাম ছিল মগ্নময়ী দেবী। প্রমথ চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা। তাঁর মায়ের নাম ছিল সুকুমারী দেবী, যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো বোন। পরবর্তীতে প্রমথ চৌধুরী বিয়ে করেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে। সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই। এই সূত্রে প্রমথ চৌধুরী হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা।

এই সম্পর্কের কারণে প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্য জীবনে ঠাকুর পরিবারের প্রভাব অনস্বীকার্য। তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এবং কবিগুরু নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, গদ্যরচনায় প্রমথ চৌধুরীর প্রভাব তিনি অনুভব করেছিলেন।

তাঁর শিক্ষা ও রুচির পরিপক্বতা, এবং ইংরেজি সাহিত্যপাঠের গভীরতা তাঁকে করে তোলে প্রগাঢ় সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে বিএ এবং ইংরেজিতে এমএ পাস করেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারি পাশ করে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু সাহিত্যচর্চার প্রতি অনুরাগ তাঁকে সরকারি চাকরি ছেড়ে সাহিত্য-সম্পাদনায় নিয়ে আসে।

‘সবুজপত্র’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি চালু করেন এমন এক গদ্যভাষা, যেখানে বক্তৃতামূলক ভারিক্কি ভাষার বদলে কথ্যরীতির সহজতা ও সাবলীলতা দেখা যায়। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যরস গ্রহণের প্রধান শর্ত হচ্ছে ভাষার স্বাভাবিকতা। তিনি বলেন, “যে ভাষায় আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে সহজ বোধ করি, সেই ভাষাই সাহিত্যের ভাষা হওয়া উচিত।”

চলিত রীতির এই গদ্যরীতি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধে যেমন স্বচ্ছন্দভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি তা পরবর্তীকালে অন্য লেখকদের লেখাতেও জনপ্রিয়তা পায়। এই পত্রিকাই ছিল চলিত ভাষায় সাহিত্যচর্চার এক বলিষ্ঠ মঞ্চ। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, মোহিতলাল মজুমদার, কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁর ভাষারীতির দ্বারা প্রভাবিত হন।

প্রমথ চৌধুরীর চলিত রীতির ভাষায় একটি বিশেষ সৌন্দর্য ছিল—তাতে ছিল স্বাভাবিকতা, বুদ্ধিদীপ্ততা ও পরিশীলিত রসবোধ। তিনি প্রমাণ করেন, এই ভাষায় গুরুগম্ভীর দার্শনিক চিন্তা যেমন প্রকাশ করা যায়, তেমনি করা যায় হালকা হাস্যরস বা সমসাময়িক সমালোচনাও।প্রমথ চৌধুরীর লেখায় কৃত্রিমতার বালাই ছিল না। তাঁর গদ্যে ছিল বলিষ্ঠতা, প্রাণবন্ততা ও সরসতা। যে ভাষায় মানুষ কথা বলে, সেই ভাষায় তিনি সাহিত্য রচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, সাহিত্য পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাতে চাইলে ভাষা হতে হবে পাঠযোগ্য ও প্রাণবন্ত। এই চিন্তাধারা থেকেই তিনি সাধুভাষার গাম্ভীর্যকে সরিয়ে রেখে চলিত রীতিকে জনপ্রিয় করেন।

বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির পথিকৃৎ হিসেবে প্রমথ চৌধুরী যে অবদান রেখে গেছেন, তা আজও গদ্য রচনার ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তাঁর হাতে বাংলা গদ্যভাষা যেমন প্রাণ পেয়েছে, তেমনি পেয়েছে সাহিত্যের মাটির গন্ধ।

চলিত রীতির প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রমথ চৌধুরী বাংলা সাহিত্যকে যে গতিময়তা ও সারল্য উপহার দিয়েছেন, তা আজও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি হয়ে আছে। সাহিত্য যেন কেবল উচ্চবর্গের বা কাব্যিকতার জন্য নয়—বরং সাধারণ পাঠকের প্রাণে প্রবেশ করার মাধ্যম—এই ভাবনাকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এজন্যই তাঁকে বাংলা গদ্যের এক নবজাগরণের মহানায়ক বলা যায়।