নারী সমাজের আলোকবর্তিকা বিদ্যাসাগর
লেখনী : শুভ জিত দত্ত
পুরুষশাসিত সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত ছিল নারী সমাজ। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীদের মর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়েছেন নির্ভীকভাবে। তিনি নারীদের শুধু জীবনের অধিকারই নয়, 'শিক্ষা' নামক আলোর মাধ্যমে বাঁচার মূলমন্ত্র দিয়েছেন।
বিদ্যাসাগর ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ। ।রাজা রামমোহনের পথ অনুসরণ করে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সমাজ সংস্কারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারী শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মনে করতেন, কোনো সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি নারীরা অনগ্রসর, অধিকারহীন ও কুসংস্কারগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। তিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের একজন নির্ভীক সমর্থক ছিলেন। তখনকার সমাজে নারীরা এতটাই দুর্বল ও অবহেলিত ছিল যে, তারা নিপীড়নের মধ্যেও নিজের মুক্তির স্বপ্ন দেখার সাহস পেত না। তিনি ভারত বষের্র নারী সমাজকে শিক্ষার মধ্যমে বাচাঁর প্রেরণা দিয়েছিলেন।বীরসিংহ গ্রামের ছোট্ট ঈশ্বরচন্দ্রের খেলার সঙ্গী ছিলেন পাশের বাড়ির এক বালিকা। বাল্যবিয়ের পর অল্প বয়সেই সে বিধবা হয়। জীবনের সব রঙ হারিয়ে ছোট্ট মেয়েটি হয়ে ওঠে এক বৈধব্যের নিঃসঙ্গ প্রতিচ্ছবি। একাদশীর দিনে যখন গ্রামের সব শিশু আনন্দে খাবার খাচ্ছিল, তখন সেই ছোট্ট মেয়েটি উপোস করে একা বসে ছিল, শুধুমাত্র বিধবা হওয়ার ‘অপরাধে’। কারণ, তখনকার রীতি অনুযায়ী বিধবাদের একাদশীতে খাওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। ঘটনাটি ঈশ্বরচন্দ্রের শিশু মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একটি নিষ্পাপ প্রাণ কীভাবে সমাজের কুসংস্কার ও নিষ্ঠুরতায় বন্দি হয়ে পড়তে পারে—সেই প্রশ্ন তাকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তখনই সে নিজেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নারীর অধিকার রক্ষায় এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন—প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদনপত্র ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেন, যাতে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে বৈধতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালেই ‘হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ পাশ হয়। বিধবাদের প্রতি সমাজের নিষ্ঠুরতা দূর করে বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের মুক্তির স্বাদ এনে দেন তিনি।নিজের একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ সম্পন্ন করে তিনি সমাজে এক সাহসিক উদাহরণ সৃষ্টি করেন। এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজপতিদের তীব্র বিরোধিতা, উপহাস ও বিদ্রূপ সহ্য করতে হয়েছিল। তবে কোনো বাধাই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্তে রক্ষণশীল সমাজ উত্তাল হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে আসে বিদ্রূপ, ঘৃণা আর হুমকি। পরিস্থিতি এতটাই হিংসাত্মক হয়ে ওঠে যে, পিতা ঠাকুরদাস চট্টোপাধ্যায় পুত্রের নিরাপত্তার জন্য নিজ গ্রাম বীরসিংহ থেকে লেঠেল পাঠাতে বাধ্য হন। বিধবাবিবাহ যেন এক জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। পত্রপত্রিকা, পণ্ডিতদের সভা, মহিলা সমাজ এমনকি সাধারণ কৃষকের ক্ষেতেও একটাই আলোচনা—বিধবাবিবাহ ও বিদ্যাসাগরের জয়গান। সেই সময় পথে-ঘাটে ছড়া কাটত সাধারণ মানুষ:
"বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে, সদরে করেছে রিপোর্ট, বিধবার হবে বিয়ে!"
এই ছড়া শুধুই এক সাহসী সংস্কারকের প্রতি ভালোবাসা নয়, এটা ছিল বাঙালির অন্তরের আর্তি—এক আলোকবর্তিকার চিরস্থায়ী প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলন নিঃসন্দেহে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজে এক বিপ্লবী পদক্ষেপ। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে শান্তিপুরের তাঁতিরা তাঁর নাম বুনে দিলেন কাপড়ে—"বেঁচে থাকুন বিদ্যাসাগর"। সেই শাড়ি পরিধান করে নারীরা যেন এক মৌন প্রতিবাদ ও সম্মতির বার্তা দিচ্ছিলেন। বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের পাশাপাশি তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন বহুবিবাহের মতো কুপ্রথা নির্মূলের জন্য।তাঁর সময়কার সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার ও অন্ধ গোঁড়ামিতে আচ্ছন্ন—বাল্যবিবাহ, সতীদাহ, বিধবাদের একাদশী পালন, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, জাতপাতের ভেদাভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি—সব মিলিয়ে এক অমানবিক সমাজচিত্র। একদিকে সমাজে নারীর সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক অন্যায়ের অবসান ঘটানো ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮৬০ সালে সরকারিভাবে কন্যাদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স দশ বছর নির্ধারণ করা হয়—যা সেই সময়কার রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে এক সাহসী পদক্ষেপ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু নারী মুক্তির আদর্শপ্রচারেই থেমে থাকেননি, বরং নারীশিক্ষা বিস্তারে তিনি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।বিদ্যাসাগরের উদ্যোগেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয় ।এই বিদ্যালয়ই পরবর্তীতে বেথুন স্কুল নামে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠা নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল, যা ভারতীয় নারী সমাজের জন্য নতুন পথ উন্মোচন করে দেয় । ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল নারীশিক্ষার প্রসারে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। গ্রামবাংলার নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় গড়ে তোলেন স্ত্রীশিক্ষা বিধায়নী সম্মেলনী। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১৩০০-এর বেশি ছাত্রী পাঠ গ্রহণ করত।
তিনি শুধু স্কুল স্থাপন করেই থেমে যাননি, সরকারের কাছে ধারাবাহিকভাবে তদবির করে এসব বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যয়ভার বহনে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করেন।ব্রিটিশ সরকার যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলোর আর্থিক দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তিনি নিজের অর্থে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও স্কুলের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেন। এ ছিল এক অকুতোভয় সমাজ সংস্কারকের আত্মোৎসর্গ। এর ফলেই ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৮৮-তে, যা নারীশিক্ষার ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।
নারীশিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষার দিকেও নজর দেন। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন, যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত। মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিজের জন্মগ্রাম বীরসিংহে প্রতিষ্ঠা করেন ভগবতী বিদ্যালয়।
পুরো সমাজ বদলে যায়নি, তবে বদলের সূচনা হয়েছিল—যার ভিত্তি আজকের নারী অধিকার আন্দোলনের শিকড়।






.png)
.png)
.png)

