Showing posts with label ছোট গল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোট গল্প. Show all posts

Tuesday, September 1, 2026

বাবুদের বাড়ি ও স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস ।। শুভজিত দত্ত ।। ছোট গল্প ।। দূর্গাপূজো

বাবুদের বাড়ি ও স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস
শুভজিত দত্ত


কালের এক দীর্ঘ পরিক্রমা পেরিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক ভবনটি যা আজ শুধুই কালের সাক্ষী । অথচ একসময়ে যে প্রাঙ্গণটি অজস্র কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত, নানা মানুষের পদচারণায় আর কোলাহলে যা সবসময় প্রাণবন্ত হয়ে উঠত, আজ তার বুক জুড়ে যেন এক দীর্ঘশ্বাসের নীরবতা। তবে পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি সেই দিনগুলো। আজও বছরের কয়েকটি বিশেষ দিনে, নানা পার্বণে তাদের উত্তরসূরিদের সরব উপস্থিতিতে কটি প্রহর নতুন প্রাণের স্পন্দনে জেগে ওঠে। 

সেদিন ঠাকুমা গল্পে গল্পে আনমনে বলছিলেন, "বাবুদের বাড়ি বলে কথা! তাদের চালচলন, ভাব-সাবেই তো একটা আলাদা আভিজাত্য ছিল।" তাদের একটু চোখের দেখা দেখার জন্য একসময় চারপাশ থেকে ভিড় জমে যেত সাধারণ মানুষের। আজও যেন চোখের পলকে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো দিনগুলোর সুবাস। বিশেষ করে, শেষবার অষ্টমীর অঞ্জলি আর ভোগের রান্নার সেই চেনা সুবাস আজও মনকে মাতাল করে দেয়। কী জানি কী জাদুটাই না মাখানো ছিল ওই ঠাকুরদালানের পাশের পুরোনো সেই হেসেলে! যেখানে দিন নেই, রাত নেই—বাবুর্চি ও কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমে কেবলই রান্না হয়ে চলেছে মহা আয়োজনে।

কিন্তু এই জৌলুষ আর আনন্দের আড়ালেও জমা হয়ে আছে কিছু  দীর্ঘশ্বাস ও করুণ স্মৃতি। ঠাকুমার মুখে প্রায়ই শোনা যায় একসময়ের সেই  দিনগুলোর কথা, যখন এই বাড়ির প্রতিটি কোণ মানুষের ভিড়ে মুখরিত থাকত। আজ সেই পরিবারে নেমে এসেছে চরম নিঃসঙ্গতা। সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনে এবং জীবিকার তাগিদে বাবুদের বংশের উত্তরসূরিরা আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে। যারা একসময় এই বিশাল প্রাসাদের দায়িত্বে ছিলেন, আজ তাদের অনেকে কেবল পুজোর কটা দিন বা কোনো বিশেষ প্রয়োজনে ক্ষণিকের অতিথি হয়ে ফেরেন। তাদের সেই খালি ঘরগুলো, উইপোকা খাওয়া কাঠের আলমারি আর নিঝুম বারান্দাগুলো যেন নীরবে কেঁদে ওঠে অতীতের সোনালী দিনগুলোর জন্য।

সেই বিশাল দালানের অনেক অংশই আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জীর্ণ, শেওলা জমে বিবর্ণ হয়ে গেছে । একসময়ে যে উঠানে হাজার মানুষের কোলাহল আর বাজনার শব্দে কান পাতা দায় ছিল, আজ সেখানে কেবল ঝরাপাতার শব্দ আর একাকিত্বের পসরা। বয়সের ভারে এবং লোকবলের অভাবে গ্রামের সাধারণ মানুষও এখন আগের মতো অবাধে সেই অন্দরমহলে প্রবেশ করার সাহস বা সুযোগ পায় না। সময়ের স্রোতে অনেক পুরনো নিয়ম হারিয়ে গেছে, আর সেই শূন্যতার ক্ষতচিহ্নগুলো আজ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে বাড়ির প্রতিটি ভাঙা কোণে।


নানা গ্রাম থেকে শত শত মানুষ আসত কেবল একপলক বাবুদের বাড়ির পূজো দেখতে। পুজোর ওই পাঁচটা দিন তিল ধারণের জায়গা থাকত না কোথাও, মানুষের ঢল নামত চতুর্দিকে। ভিড় ঠেলে বারবার ছুটে ছুটে যেতে ইচ্ছে করত ওই পুরোনো দালানটার খুব কাছে। বনেদিয়ানার একবিন্দু ঘাটতি আজও সেখানে চোখে পড়ে না। সেকালের সাথে একালের যান্ত্রিক জীবনের কিছুটা তফাৎ তৈরি হলেও, তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী জৌলুষ এতটুকুও ম্লান হয়নি; বরং সময়ের সাথে তার মহিমা আরও যেন গভীর হয়েছে।

শহরের পুজো গুলো যেখানে আজকাল নিত্যনতুন থিম আর কৃত্রিম আড়ম্বরের বেড়াজালে ঢাকা পড়ে যায়, বনেদি বাড়ির ক্ষেত্রে ছবিটা ঠিক তার উল্টো। এখানে প্রবেশ করলেই গায়ে লাগে খাঁটি সাবেকিয়ানা আর নাড়ির টানের পরশ। আচার-নিয়মের কড়াকড়িতে ঠাসা নিখুঁত পুজো, পুরোহিতের গম্ভীর মন্ত্রপাঠ আর প্রতিমা নির্মাণে সেই সনাতন ঢং—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। গ্রামীণ পরিবেশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ির চারপাশের সবুজ গাছপালা আর যত্নে লাগানো লতাগুল্ম এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। পুজো এলেই বর্ণিল আলোকসজ্জা আর হরেক রকম সাজে সেজে ওঠে সেই মহোত্তম ভবন। গ্রামের প্রতিটি মানুষ দল বেঁধে পরম উৎসাহে ছুটে যায় বাবুদের বাড়ির পুজো উপভোগ করতে; যার প্রতিটি মুহূর্ত এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

গ্রামের সাধারণ পুজো আর এই বনেদি বাড়ির পুজোর আয়োজনের মধ্যে ব্যবধান যেন আকাশ-পাতাল। বিজয়া দশমীর বিসর্জনের বর্ণাঢ্য মিছিলে তাদের উপস্থিতি থাকে সবার আগে। মহাধুমধাম আর ঢাকের বাদ্যের তালে তালে সম্পন্ন হয় বিসর্জনের পর্ব। কৈশোরের সেই দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে চলে যাওয়া, আর বাবুদের বাড়ির কোনো এক নিরিবিল কোণে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া—সব মিলিয়ে এক সোনালী সময় ছিল সেগুলো। দেখতে দেখতে চোখের পলকে ফুরিয়ে যেত পুজোর দিনগুলো, বুঝতেই পারতাম না। আর সেই সমস্ত শৈশবস্মৃতি, উন্মাদনা আর পুজোর সব আনন্দের মূলে ছিল কেবল ওই একটাই নাম—বাবুদের বাড়ি।