জমিদার বাড়ির অন্দরমহল থেকে রঙ্গমঞ্চ
উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং নাট্যচর্চার প্রসারে জমিদার বাড়ি ও তাদের অভ্যন্তরীণ রঙ্গমঞ্চগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেকালের বহু জমিদার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে বাংলার জমিদার ও অভিজাতরা ছিলেন বাংলা নাট্যচর্চার মূল পৃষ্ঠপোষক। তাদের অর্থায়নে এবং উদ্যোগে জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে বা নাটমন্দিরে নিয়মিত নাটক মঞ্চস্থ হতো, যা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সেসময়ে সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থেকে অনেক জমিদার বাড়িতে আলাদা স্থায়ী বা অস্থায়ী রঙ্গমঞ্চ নির্মিত হয়েছিল। এই রঙ্গমঞ্চগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত শখের নাট্যদল। এসব নাট্যদলে কেবল পেশাদাররাই নন, বরং জমিদার পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত বিশিষ্টজনেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাটকে অংশ নিতেন কিংবা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরো পরিবেশ উপভোগ করতেন।
জমিদারদের সাংস্কৃতিক পরিধি কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা কোলকাতা বা অন্যান্য বড় শহর থেকে পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী বা খ্যাতিমান গায়ক-শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এনে নিজ জমিদার বাড়িতে নাটক মঞ্চস্থ করাতেন। যাত্রা এবং ক্ল্যাসিক্যাল নাটকের পাশাপাশি আধুনিক নাটকের প্রচলনও এভাবেই মফস্বল ও জনপদে প্রসার লাভ করেছিল। দেশ ও বিদেশের নামকরা নাট্যদল এবং শিল্পীদের এই পদচারণা গ্রামীণ জনপদে এক নতুন সংস্কৃতির হাওয়া বয়ে দিয়েছিল।
পূজা-পার্বণ, পুণ্যাহ বা জমিদার বাড়ির কোনো বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে এসব আয়োজন আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে উঠত। জমিদার বাড়িতে তখন মাসব্যাপী বা দিনব্যাপী নাট্যানুষ্ঠান চলত। এই বর্ণিল উৎসবগুলো কেবল জমিদারদের বিনোদনই ছিল না, বরং তা সাধারণ প্রজাদের আনন্দ ও বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মানিকগঞ্জের সাতুরিয়ায় অবস্থিত বিখ্যাত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি এবং এর জমিদাররা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এ ক্ষেত্রে কিশোরী লাল রায় চৌধুরী এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, যিনি নাট্য পরিচালনা ও অভিনয়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। জমিদারদের এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুরাগ ও ব্যক্তিগত দক্ষতা তৎকালীন সময়ে গ্রামীণ জনপদের নাট্যচর্চাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
গোবরডাঙা ও এর সংলগ্ন অঞ্চলেও নাট্যচর্চার এক বর্ণিল ইতিহাস রয়েছে। জানা যায় যে, দীনবন্ধু মিত্র তাঁর বিখ্যাত দুটি প্রহসন নাটক ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ ও ‘জামাই বারিক’ সারদা প্রসন্নর অতিথি হিসেবে প্রসন্ন ভবনে বসেই লিখেছিলেন। জমিদারি ঘরানার নাট্যচর্চার প্রথম পর্ব শুরু হয় পার্শ্ববর্তী গ্রাম ইছাপুরে, কোনো এক দুর্গানবমীর রাতে। ইছাপুর ও জমিদারি সংলগ্ন অঞ্চলে ভদ্রলোক ধনী ব্যক্তিদের আনুকূল্যে মন্দিরের ঘেরা চৌহদ্দির মধ্যে এই নাটকের সূত্রপাত ঘটে এবং এর অন্তত প্রায় ৭০ বছর পর ‘ওপেরা’ তৈরি হয়। সারদাপ্রসন্নর ভবনে দুর্গোৎসব উপলক্ষে থিয়েটার চর্চা তার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে জমিদারি চৌহদ্দির বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এই নাট্য আন্দোলন এবং নাট্য চর্চার দ্বিতীয় আর এক কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয় ইছাপুরের দোল মন্দিরে, যা আজও বর্তমান।
বাংলার জমিদার বাড়ির নাট্যচর্চার ইতিহাসে ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছা উপজেলা সদরে অবস্থিত জমিদার বাড়িটি এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। জমিদার ভূপেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী এই বিখ্যাত ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চটি নির্মাণ করেছিলেন। এই নাট্যমঞ্চটির মূল আকর্ষণ ছিল এর ঘূর্ণায়মান প্রযুক্তি, যা নাটক মঞ্চায়নকে আরও নান্দনিক ও সহজ করে তুলেছিল। বিশেষ এই রঙ্গমঞ্চটিকে এশিয়ার প্রথম ঘূর্ণায়মান মঞ্চ বলা হয়, যা জমিদারদের আমোদ-প্রমোদ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং বিভিন্ন নাটক বা যাত্রাপালা আয়োজনের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
বাংলার জমিদার বাড়ির নাট্যচর্চা এবং তাদের সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক সোনালী অধ্যায়। প্রাতিষ্ঠানিক থিয়েটার গড়ে ওঠার আগে বাংলার নাট্যশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এর শেকড়কে শক্ত করতে এই জমিদার বাড়িগুলোর রঙ্গমঞ্চ এবং জমিদারদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

No comments:
Post a Comment