Monday, December 15, 2025

প্রাচীন আর্য সমাজ ও জাতিভেদ প্রথা: ইতিহাস ও প্রভাব

প্রাচীন আর্য সমাজ ও জাতিভেদ প্রথা: ইতিহাস ও প্রভাব

অপরিহার্য প্রয়োজনের কারণে আদিম আর্য সমাজে চারটি জাতির সৃষ্টি হয়। তখন সমাজের মানুষ নিজেদের কাজ ভাগ করে নিয়েছিল। কেউ কৃষিকাজ করত, কেউ যুদ্ধ করত, কেউ পূজা-পাঠ করত, আবার কেউ সেবা ও অন্যান্য কাজ করত। সেই সময় আজকের মতো কঠোর জাতিভেদ বা উঁচু-নিচুর ধারণা ছিল না।


বর্তমান সময়ে জাতিভেদের তিনটি প্রধান লক্ষণ দেখা যায়। প্রথমত, নিচু জাতির মানুষের কাছ থেকে অন্ন বা জল গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে বিবাহ করা যায় না। তৃতীয়ত, জাতিভেদ অনুযায়ী মানুষের পেশা আলাদা করে নির্ধারিত থাকে। কিন্তু আদিম আর্য সমাজে এই ধরনের কোনো নিয়ম বা বৈষম্য ছিল না।

সময়ক্রমে প্রাচীন আর্য সমাজে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা ও প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের ক্ষমতা যত বাড়তে থাকে, ততই অন্য জাতিগুলোর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এমনকি রাজাদের ক্ষমতাও শুধু নামমাত্র হয়ে পড়ে; বাস্তবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব ব্রাহ্মণরাই পালন করতেন। বৈশ্যদের অবস্থাও ক্রমে দুর্বল হয়ে যায়। আর শূদ্রদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ; তারা সমাজের সব রকম ক্ষমতা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের জীবনযাপন করত। তাদের সামাজিক দুর্দশার কোনো সীমা ছিল না।

ব্রাহ্মণরা শূদ্রদের কঠোর দাসত্বে আবদ্ধ করেই সন্তুষ্ট থাকতেন না। মানুষের জীবনে অর্থ উপার্জনের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রিয় অধিকার হলেও, সেই অধিকার থেকেও শূদ্রদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। যদি শূদ্ররা ধনী হয়ে উঠত, তাহলে ব্রাহ্মণদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কমে যেতে পারত—এই আশঙ্কায় তাদের ধন সঞ্চয় করতে দেওয়া হতো না। শূদ্ররা নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারত না, বিশ্রাম বা চলাফেরা করতেও স্বাধীন ছিল না। শরীরের রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত সম্পদের উপরও তাদের কোনো অধিকার থাকত না। সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র ক্ষমতা রক্ষা করা।

যতই পাশ্চাত্য সাহিত্য ও বিজ্ঞান চর্চা বৃদ্ধি পেতে লাগল, মানুষের চিন্তা ও মননের বিকাশও ততই বেড়ে গেল। বর্তমান শাসকরাও বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখলেন। ফলে তর্ক, প্রচার বা আন্দোলন ছাড়াই শিক্ষিত মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে কুসংস্কার দূর হয়ে যাচ্ছে। এখন ঈশ্বর একজনকে ব্রাহ্মণ আর একজনকে শূদ্র বানিয়েছেন—এই ধারণা এমনকি বারো বছরের স্কুলপড়ুয়া শিশুর কাছেও হাস্যকর মনে হয়।

মুদ্রণযন্ত্রের প্রসারের ফলে প্রাচীন শাস্ত্রগুলো সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে। যা আগে ব্রাহ্মণরা গোপন রেখে নিম্নজাতের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন, তা এখন সেই মানুষদের হাতেই পড়ছে। প্রাচীন কালে শাস্ত্রকাররা বলেছিলেন, শূদ্রদের বেদ পড়ার অধিকার নেই। কিন্তু আজ শূদ্ররাই নয়, এমনকি বিদেশিরাও বেদের গবেষক হয়ে উঠেছেন, এবং আমাদেরকেও তাদের কাছ থেকে বেদ ও বেদাঙ্গের অর্থ শিখতে হচ্ছে।

এই সব কারণে বর্তমান সময়ে জাতিভেদ প্রথা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজকের পাশ্চাত্য সভ্যতার মতো শক্তিশালী শত্রু এই প্রথার আর নেই। বলা যায়, জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে আলাদা করে আক্রমণ চালানোর প্রয়োজন এখন আর নেই।

জাতিভেদ প্রথার কারণে বিবাহ সম্পর্কও সীমিত হয়ে গেছে। একই গোষ্ঠীর মধ্যেই বারবার বিবাহ হওয়ার ফলে রক্তের মিশ্রণ ঘটেনি। প্রাণীজগতের পরীক্ষিত সত্য হলো—যদি কোনো জাতি অল্প পরিসরে বারবার বিবাহ করে, তাহলে সেই জাতির শক্তি ও কর্মক্ষমতা দ্রুত কমে যায়।

জাতিভেদ প্রথা এদেশের মানুষের জন্য পরবর্তী দাসত্ব গ্রহণ করা সহজ করে দিয়েছিল। দেশে সবসময় ব্রাহ্মণের সংখ্যা বেশি ছিল। এই ব্রাহ্মণরা কঠোর আধ্যাত্মিক দাসত্বের মধ্যে বাস করায় তাদের মানবিকতা অনেকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফলে যখন বিদেশিরা এই দেশ আক্রমণ করেছিল, তখন এমন মনুষ্যত্বহীন ও দাস্য-অভ্যস্ত মানুষরা সহজেই তাদের দাসত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছিল।

প্রাচীন আর্য সমাজে জাতিভেদ প্রথার ক্রমবিকাশের ফলে সমাজে বৈষম্য ও দাস্য বেড়ে যায়। কিন্তু শিক্ষা, বিজ্ঞান ও মুদ্রণযন্ত্রের প্রসার এই প্রথার বিরোধিতা করে এবং সমানাধিকারের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। আজকাল জাতিভেদ প্রথা ইতিহাসের পাতা হয়ে গেছে, আর মানুষের মন ও চিন্তা ক্রমে তা অগ্রাহ্য করছে।