বউলের ছবি আঁকা
আমার তুলির টানে ফুটে উঠেছে এক বাউলের সুর, যেন তার একতারার রেশ লেগে আছে এই ছবিতে। মাটির গান আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে এক অপূর্ব সৃষ্টি, এই বাউল যেন আমাদের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।
বউলের ছবি আঁকা
আমার তুলির টানে ফুটে উঠেছে এক বাউলের সুর, যেন তার একতারার রেশ লেগে আছে এই ছবিতে। মাটির গান আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে এক অপূর্ব সৃষ্টি, এই বাউল যেন আমাদের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।
প্রাচীন মহেশপুরের ইতিহাস
বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মহেশপুর কেবল একটি জনপদ নয়, বরং এটি প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বলয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।মহেশপুর কেবল ঝিনাইদহ জেলার একটি উপজেলা নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের এক প্রাচীন ও জীবন্ত সংগ্রহশালা। রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সেন আমল ও কৈবর্ত শাসন—প্রতিটি যুগেই মহেশপুর তার নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বল ছিল।মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, মহারাজ বলি ও মহর্ষি দীর্ঘতমার আশীর্বাদে পাঁচটি শক্তিশালী জনপদের সৃষ্টি হয়। এই পাঁচ পুত্রের নামে নামকরণ করা হয়— অঙ্গ, বঙ্গ, কালিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম। ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন পুণ্ড্র ও সুহ্ম জনপদের বিস্তৃতি আজকের যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, মহেশপুর প্রাচীন বঙ্গের সেই আদি সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক সীমানার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
মহেশপুরের ইতিহাসে সেন রাজবংশের একটি নাটকীয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে।সেন বংশের ইতিহাসে বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেনের যে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা শোনা যায়, মহেশপুরের ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটে ঠিক সেখানেই। লোক-ইতিহাস অনুযায়ী, রাজা বল্লাল সেন যখন একজন নিম্নবর্ণীয় নারীকে গ্রহণ করেন, তখন তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে রাজ্য ত্যাগ করেন।পরবর্তীতে রাজা অনুতপ্ত হন এবং ঘোষণা করেন—যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বে তাঁর হারানো পুত্রকে ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাকে রাজ্যের একাংশ উপহার দেবেন। এই দুঃসাধ্য কাজে সফল হন সূর্যনারায়ণ নামক এক ব্যক্তি। পুরস্কার হিসেবে তিনি লাভ করেন সূর্যদ্বীপ অঞ্চল।ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই সূর্যনারায়ণের প্রশাসনিক কেন্দ্র বা রাজধানী গড়ে উঠেছিল আজকের মহেশপুরে। এই সূর্যনারায়ণ ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ একজন শাসক।তাঁর শাসনের ফলেই একসময় এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি ‘সূর্য মাঝির দেশ’ নামে পরিচিতি পায়। আজও মহেশপুরের আনাচে-কানাচে সেই প্রাচীন ইতিহাসের রাজা সূর্যনারায়ণের সেই সমৃদ্ধ রাজধানীর স্মারক ও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়।
কৈবর্ত শাসন ও মহেশপুরের জলবেষ্টিত দ্বীপভূমি
সেন যুগের আগে বা সমসাময়িক সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় কৈবর্তরা অত্যন্ত শক্তিশালী স্থানীয় শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁরা ছিলেন মূলত নদীবহুল অঞ্চলের মানুষ, তাই জলপথের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ছিল অবিসংবাদিত।তৎকালীন মহেশপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল আধুনিক কালের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রমত্তা ভৈরব নদী মহেশপুরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রবাহিত হতো। অসংখ্য নদী আর খাঁড়ির জালে ঘেরা এই জনপদটি তখন বহু ছোট-বড় দ্বীপ বা ‘ব-দ্বীপ’-এর সমষ্টি ছিল। প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যের জন্য এই দ্বীপগুলো ছিল অত্যন্ত নিরাপদ।
এই দ্বীপভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বৃহত্তম দ্বীপটি ছিল ‘যোগীন্দ্রদ্বীপ’। বর্তমান বনগ্রামের উত্তর অংশ জুড়ে বিস্তৃত এই দ্বীপটি কেবল আয়তনেই বড় ছিল না, এটি ছিল অত্র অঞ্চলের ক্ষমতার উৎস বা প্রশাসনিক কেন্দ্র।এই বিশাল যোগীন্দ্রদ্বীপের প্রধান নগর হিসেবে গড়ে উঠেছিল মহেশপুর। জলবেষ্টিত এই নগরীতে প্রবেশের জন্য সুশৃঙ্খল নৌ-ব্যবস্থা ছিল, যা এই অঞ্চলকে তৎকালীন বাংলার এক অনন্য জলদুর্গ বা ‘Riverine Fortress’-এর মর্যাদা দিয়েছিল। এই দ্বীপের ঐতিহ্য ও সূর্য রাজার স্মৃতি আজও মহেশপুরের পরিচয় বহন করে চলেছে।
ব্রিটিশ আমলের বনগ্রাম মহকুমা ও আজকের মহেশপুর
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বর্তমান যশোর ও নদীয়া অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ‘কুশদ্বীপ’ নামে পরিচিত ছিল। পদ্মা, ভৈরব ও চিত্রা নদীবেষ্টিত এই দুর্গম অঞ্চলে রাজস্ব আদায় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কোম্পানি সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যেই কুশদ্বীপকে ভেঙে ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হয়, যার ফলে উদ্ভব ঘটে ‘বনগ্রাম’ (বর্তমান বনগাঁ) এলাকার।দীর্ঘ সময় ধরে বনগ্রাম ও মহেশপুর অঞ্চলটি নদীয়া ও যশোর জেলার মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। অবশেষে ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন এক স্থায়ী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়:বনগ্রাম মহকুমাকে স্থায়ীভাবে যশোর জেলার সাথে একীভূত করা হয়।এই মহকুমার অধীনে ছিল চারটি গুরুত্বপূর্ণ থানা: শার্শা, গাইঘাটা, বনগ্রাম ও মহেশপুর।সেই সময়ে মহেশপুর কেবল একটি থানাই ছিল না, বরং এটি ছিল এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র। সীমান্তবর্তী অবস্থান ও উর্বর কৃষিজমির কারণে মহেশপুর ব্রিটিশ আমলেই এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেছিল।বৃহত্তর যশোর জেলা ও মহেশপুর
মহেশপুরের ইতিহাস কেবল একটি জনপদের গল্প নয়, বরং এটি বৃহত্তর বাংলার প্রশাসনিক পরিবর্তনের এক জলজ্যান্ত দলিল। প্রাক-ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত মহেশপুরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে যশোর ছিল একটি প্রভাবশালী ও স্বতন্ত্র রাজ্য। স্থানীয় জমিদার ও রাজপরিবার পরিচালিত এই রাজ্যের মূল ভিত্তি ছিল কৃষি ও নদীপথের বাণিজ্য। নদ-নদীর প্রবাহ এবং কারুশিল্পের মেলবন্ধনে যশোর তখন দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার প্রধান শক্তির কেন্দ্র। সেই সময়ে মহেশপুর এই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর ছায়াতলে একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে ধীরে ধীরে নিজের গুরুত্ব তৈরি করে।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলার ক্ষমতা দখল করে, তখন তারা তাদের রাজস্ব আদায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সুবিধার্থে পুরনো প্রশাসনিক কাঠামো বদলে ফেলে। এর ফলে স্বাধীন যশোর রাজ্য প্রথমে যশোর ডিভিশনে রূপান্তরিত হয়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে কোম্পানি সরকার এই বড় অঞ্চলটিকে ডিভিশন ভিত্তিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে।প্রশাসনিক জটিলতা আরও কমাতে এবং স্থানীয় শাসনকে জনমানুষের কাছাকাছি নিতে পরবর্তীকালে বিশাল যশোর ডিভিশন ভেঙে বৃহত্তর যশোর জেলা গঠিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে পুলিশ প্রশাসন, আদালত এবং ভূমি জরিপ ব্যবস্থার একটি সুসংগঠিত রূপ তৈরি হয়। যশোর জেলার এই নতুন প্রশাসনিক মানচিত্রে মহেশপুর তখন একটি সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিচয় লাভ করে।ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের শাসন কাঠামো ছিল প্রেসিডেন্সি বিভাগ। একসময় যশোর ও খুলনা অঞ্চল একত্রে এই প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যবস্থার অধীনে রাজস্ব, ভূমি জরিপ এবং সামরিক তদারকি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হতো। যশোর ও খুলনার এই একীভূত অবস্থান দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাকে ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। মহেশপুর এই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বলয়ের অংশ হিসেবে সড়ক ও নৌপথের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।
এই ধারাবাহিক প্রশাসনিক রূপান্তর শুধু কাগুজে পরিবর্তন ছিল না; এটি এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষভাবে—
নদীপথ-নির্ভর পুরোনো বাণিজ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশরা বাজার, কুঠি এবং বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসেবে মহেশপুরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
জমিদারি প্রথা, ভূ-রাজস্ব ব্যবস্থা, সেচব্যবস্থা এবং ভূমি জরিপের নতুন নীতিমালা কৃষি উৎপাদন ও ভূমিব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। কৃষিজমির শ্রেণিবিন্যাস ও রাজস্ব আদায় পদ্ধতির ফলে মহেশপুরের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন কাঠামো গড়ে ওঠে।
ব্রিটিশ শাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রেলপথ নির্মাণ। যদিও মহেশপুরে সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হয়নি, তবুও যশোর–খুলনা অঞ্চলে রেলপথের বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং মহেশপুরের বাণিজ্যিক লেনদেন ও জনস্রোতে পরিবর্তন আনে।
প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, ডাক-বিভাগ, বাজার, হাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। এসব পরিবর্তন মহেশপুরের সমাজে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক বিন্যাস গড়ে তোলে— যাত্রা, লোকসংগীত, মেলা, বিদ্যালয় স্থাপন, পাড়াপ্রতিবেশী সমন্বয়—সব মিলিয়ে মহেশপুর নতুনভাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
এই সব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মহেশপুর ধীরে ধীরে একটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সীমান্তবর্তী অবস্থান, হাট-বাজারের বিকাশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠার প্রসার, এবং লোককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিস্তার—এই সব মিলিয়ে মহেশপুরের পরিচয় পূর্বের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বনগ্রাম মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার যেসব অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার দ্রুত ঘটে, তার মধ্যে মহেশপুর বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই অঞ্চলে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ বাড়ে, আর এর ফলস্বরূপ মহেশপুরেই প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম মহকুমার অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয় শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদ্ভব, লেখাপড়া জানা কৃষিজীবী ও বণিক শ্রেণির বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে মহেশপুরে গড়ে ওঠে এক নতুন আলোকায়ন।
মহেশপুরের সমাজ কাঠামো ছিল বহুমাত্রিক। বিভিন্ন বর্ণ ও উপবর্ণের মানুষ এখানে বসবাস করলেও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়—
বর্ণভেদ ছিল, কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ ছিল না।
গ্রামীণ সমাজের স্বাভাবিক স্তরবিন্যাস বজায় থাকলেও এই অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি ছিল সুস্পষ্ট। বিবাহ, হাট-বাজার, কৃষিকর্ম, উৎসব—সব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকত।
মহেশপুরের অর্থনৈতিক জীবন ছিল মূলত কৃষি নির্ভর, তবে এ অঞ্চলে কারুশিল্প, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প এবং স্থানীয় বণিক শ্রেণির সক্রিয় উপস্থিতি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা প্রদান করে। কৃষিজ উৎপাদন, নিকটবর্তী বাজারগুলোর সক্রিয়তা এবং ছোট-বড় হাট-বাজারের মাধ্যমে এখানে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে—
কৃষিজীবী শ্রেণি
কারুশিল্পী
বণিক শ্রেণি
—সবাই মিলেই মহেশপুরের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল প্রাণবন্ত, বৈচিত্র্যময় এবং জনসম্পৃক্ত। মহেশপুরে বারোয়ারী যাত্রা, যাত্রাপালা, লোকগীতি, বাউল গান, পাঁচালি, মেলা-উৎসব—এসব ছিল মানুষের নিত্যজীবনের অংশ।
সাধারণ মানুষ যেমন কৃষিকাজে আনন্দ খুঁজে পেত, তেমনি সন্ধ্যার অলোয় সংস্কৃতিকেও লালন করত।
এই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো—
বনগ্রাম ও গোপালনগর অঞ্চলের মধ্যবর্তী ‘ট’ বাজার ছিল এক ঐতিহাসিক সমাগমস্থল। প্রতি বছর এই বাজারের চাঁদনি তলায় অনুষ্ঠিত যাত্রা উৎসব পুরো মহেশপুর-সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষকে একত্র করত।
বিশেষত্ব ছিল—
সব বর্ণ, সব সম্প্রদায়ের মানুষ অভিন্ন আনন্দে অংশ নিত
পেশাভেদ, ধর্মভেদ বা সামাজিক দূরত্ব এখানে গুরুত্ব পেত না
যাত্রাপালা, লোকসঙ্গীত, নাট্যপ্রদর্শনী—সব মিলিয়ে তৈরি হতো বহুমাত্রিক লোকজ পরিবেশ
এই উৎসব ছিল শুধু বিনোদন নয়; সামাজিক ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও এক অনন্য ক্ষেত্র।
বনগ্রাম মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার যে কেন্দ্রগুলো প্রথমে বিকশিত হয়, তার মধ্যে মহেশপুর ছিল অগ্রগণ্য। মহেশপুর অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবন, বাণিজ্যিক কার্যকলাপ ও আদি জনপদের সংগঠিত কাঠামোর কারণে এখানেই মহকুমার প্রাচীনতম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিদ্যালয়টি বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদাহ জেলার অন্তর্গত মহেশপুরে অবস্থিত।উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, বিশেষত ইংরেজ বর্ধিষ্ণু প্রশাসনিক নীতির ফলে শিক্ষা বিস্তারের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়। মহেশপুর, যেটি সেই সময় বনগ্রাম সাবডিভিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, সেখানে বিদ্যালয় স্থাপন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার নতুন ধারার সূচনা ঘটায়।মহেশপুরে প্রাচীন বিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশক পর বনগ্রামের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাবর্ষ ১৮৬৮ ইংরেজি, যা এই অঞ্চলের শিক্ষাগত বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।মহেশপুরে প্রাচীন বিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশক পর বনগ্রামের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়।তৎকালীন সময়ে বনগ্রাম কুশদ্বীপের বিভক্ত অংশ হিসেবে কখনো নদীয়া, কখনো যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রশাসনিক এই ওঠানামার মধ্যেও মহেশপুর ও বনগ্রামের বিদ্যালয়সমূহ।
তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত মহেশপুর উপজেলার প্রাচীন হলদা গ্রাম শুধুমাত্র একটি সাধারণ জনপদ নয়—এটি বাংলার বৈষ্ণব সাধনার এক অনন্য তীর্থস্থান। এই অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে বিশেষত দ্বাদশ গোপাল শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিত (সুদাম গোপাল)-এর স্মৃতিবহ শ্রীপাটকে কেন্দ্র করে।
হলদা গ্রামের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে, শান্তস্বভাব বেত্রবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই শ্রীপাট। নদীপথের ধারাবাহিকতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রশান্তি বৈষ্ণব সাধকদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছিল—যা আজও ইতিহাসের ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই শ্রীপাটেই স্থাপিত ছিল—
শ্রীশ্রী রাধাবল্লভ জিউ
শ্রীশ্রী রাধারমণ জিউ
এই দুই বৈষ্ণব বিগ্রহ বহু প্রজন্ম ধরে এখানে পূজিত হয়েছে। পরবর্তীকালে সৈদাবাদ অঞ্চলের গোস্বামীগণ বিশেষ কারণে বিগ্রহ স্থানান্তর করেন। তবে শ্রীপাটের ঐতিহ্য ও নিয়মিত পূজার মানসিকতা অটুট রাখতে স্থানীয় ভক্তসমাজ কাঠের বিগ্রহ (দারুময় মূর্তি) প্রতিষ্ঠা করে পূজা চালু রাখেন। আজও প্রতিদিন অর্ঘ্য, সেবাপূজা ও কীর্তনের মাধ্যমে এখানে বৈষ্ণব সাধনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
প্রতি বছর অগ্রহায়ণী কৃষ্ণ পক্ষের প্রতিপদ তিথিতে পালিত হয় শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিতের তিরোভাবোৎসব। এই তিথি স্থানীয় বৈষ্ণবসমাজে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় পালন নয়, বরং তা এক মহোৎসবে পরিণত হয়। হাজারো ভক্ত, কীর্তনীয়, সাধু-মহাত্মা ও শ্রীমৎ ভাগবত অনুরাগীরা এই উৎসবে অংশ নিতে সমবেত হন।
উৎসবের প্রধান আকর্ষণ—
অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন
ভোগ-প্রসাদ বিতরণ
ভাগবত আলোচনা
গোপাল-পরম্পরার বংশীয়দের আচার-অনুষ্ঠান
এই উৎসব প্রতি বছর মহেশপুর অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক–ধর্মীয় সমাবেশ সৃষ্টি করে।
ইতিহাসে দেখা যায়, মহেশপুরের জমিদারগণ যুগের পর যুগ এই শ্রীপাটের প্রধান সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শ্রীপাটের জমি, সম্পত্তি, বিগ্রহ ও উৎসব পরিচালনা সংগঠিত হতো। জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই শ্রীপাটের পূজা-পার্বণ সুসংগঠিত থাকে এবং সামাজিক ঐতিহ্য অটুট থাকে।
শ্রীল সুন্দরানন্দ পণ্ডিতের শিষ্যবংশ বর্তমানে মঙ্গলভিহি গ্রামে বসবাস করছেন। সেখানকার বিখ্যাত শ্রীশ্যামচাঁদ জিউ আজও নিয়মিত পূজিত হন। শিষ্যবংশীয়দের মাধ্যমে বৈষ্ণব দর্শন, নামতত্ত্ব, শ্রীমৎ ভাগবত ধর্ম ও গোপাল-লীলা প্রচারিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
মহেশপুরের হলদা গ্রামের এই শ্রীপাট কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, বরং—
বৈষ্ণব সাধনার গবেষণামূলক কেন্দ্র
গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসের অংশ
লোকসংস্কৃতি ও কীর্তনের জীবন্ত ভাণ্ডার
সামাজিক সমন্বয় ও আধ্যাত্মিক চর্চার কেন্দ্র
গোপাল-পরম্পরা, বৈষ্ণব দর্শন, সঙ্গীত, এবং সম্প্রদায়-আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে এই শ্রীপাট দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ধর্ম-ইতিহাসে একটি বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে।
বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে জয় গোপাল তর্কালঙ্কার (১৭৭৫–১৮৪৪) ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। নদীয়া জেলার (বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার মহেশপুর) অন্তর্গত বজরাপুর গ্রামে ১৭৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করা এই পণ্ডিতের জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও বাংলা ভাষার উন্মোচনে নিবেদিত। তার পিতা কেবলরাম ভট্টাচার্য তর্কপঞ্চানন ছিলেন নাটোররাজের সভাসদ।
প্রাথমিক জীবন থেকে জ্ঞান অন্বেষণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তার মধ্যে। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বৃদ্ধ পিতা কেবলরাম যখন তাকে সঙ্গে নিয়ে কাশীবাসী হন, সেখানেই তিনি গভীর শিক্ষা লাভ করেন এবং সাহিত্যশাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তার সমসাময়িককালে তার তুল্য শাব্দিক বা ভাষাবিদ খুব কমই দেখা যেত।
জীবনের এক পর্যায়ে সাংসারিক সংকটে পড়লেও, তার মেধা ও অধ্যবসায় তাকে সঠিক পথে চালিত করে। ত্রিশ বছর বয়ঃক্রমকালে ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শ্রীরামপুরের উইলিয়াম কেরির অধীনে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৮১৩ সালে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজের সাহিত্য অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি বহু কৃতী ছাত্রের জন্ম দেন, যাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তারাশঙ্কর ও মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মতো দিকপালরা ছিলেন। তিনি তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের জজ পণ্ডিতদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন। কেবল তাই নয়, কেরি ও মার্শম্যানের মতো সাহেবরাও তার কাছে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন।
জয় গোপাল তর্কালঙ্কারের প্রধান এবং যুগান্তকারী অবদান হলো বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে। শ্রীরামপুরে যখন বাংলা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়, তখন তিনিই সর্বপ্রথম কৃত্তিবাসের রামায়ণ এবং কাশীদাসের মহাভারত পরিশোধিত করে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত বাংলা ভাষার বর্তমান উন্নতির সূত্রপাত করেন। যদিও এই গ্রন্থগুলোর পাঠ বিকৃত করার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন, তবে বাংলা ভাষায় প্রাচীনতম সাহিত্যকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি তিনিই প্রথম করেছিলেন।
রামায়ণ ও মহাভারত ছাড়াও, তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে বিশ্বমঙ্গলের হরিভক্ত্যাত্মিকা সংস্কৃত কবিতাগুলির বঙ্গানুবাদ এবং 'পারসী অভিধান' নামে একটি অভিধান। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লেখক ও সুকবি।
১৮৪৪ সালে এই মহান পণ্ডিত লোকান্তরিত হন। তার কর্ম এবং শিক্ষা আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক নতুন পথের দিশা দিয়েছিল।
তথ্যসূত্র: নির্মল কুমার মুখোপাধ্যায় (ইতিহাসের বনগ্রাম)
সতীশচন্দ্র মিত্র (যশোহর-খুলনার ইতিহাস )
শ্রীহরিদাস দাস(শ্রীশ্রী গৌড়ীয় বৈষ্ণব তীর্থ বা শ্রীপাঠ বিবরণী)
শ্রীকুমুদনাথ মল্লিক(নদীরা-কাহিনী)
চৈতন্য যুগে তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর অন্তরঙ্গ সঙ্গী হিসেবে আবির্ভূত হন। চৈতন্য চরিতামৃত ও চৈতন্য ভাগবত—উভয় গ্রন্থেই তাঁর ভক্তি, অনন্য সেবাভাব ও অলৌকিক কীর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভক্তি ও সাধনায় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করেছিলেন। তাঁর জীবনের বিশেষ দিক হলো—তিনি কখনো বিবাহ করেননি। তাই তাঁর নিজের কোনো বংশধর নেই।
শ্রীবৃন্দাবন-লীলায় শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সঙ্গী ও সহচরগণ ‘গোপাল’ নামে পরিচিত।
এই গোপালরা শুধু সাধারণ বন্ধু নন; তারা শ্রীকৃষ্ণের দৈনন্দিন লীলা, ক্রীড়া, অবসরের হাসি-আনন্দ থেকে শুরু করে বিপদ-কঠিন সময়ে সঙ্গদান—প্রত্যেক ক্ষেত্রে অবিচ্ছেদ্য সাথী। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে, এই সখাগণ ভক্তিভাবের স্বরূপ অনুযায়ী মোট চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত।
সুহৃত্-শ্রেণীর সখারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর স্নেহে আবদ্ধ। তাঁদের সেবা-ভাব মূলত বন্ধুত্বের সঙ্গে স্নেহ ও মমতার সমন্বয়। তাঁরা কৃষ্ণের কল্যাণকে সর্বাগ্রে রাখেন এবং তাঁর যেকোনো প্রয়োজন বা সংকটে ছুটে আসেন।
সখারা শ্রীকৃষ্ণের সাধারণ বন্ধুবৃত্ত। তাঁরা কৃষ্ণের সঙ্গে খেলাধুলা, গোপন হাসিঠাট্টা, বনভ্রমণ, গোঁফে দই লাগানো ইত্যাদি নানা লীলায় সমভাবে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে সমান বয়সের সহজ ও নির্ভার বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রবল।
প্রিয়সখারা কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত গভীর এবং প্রগাঢ় স্নেহে আবদ্ধ। তাঁদের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক আরও আন্তরিক। তাঁরা কৃষ্ণের ব্যক্তিগত অভিরুচি, স্বভাব, শখ—এসব বিষয়ে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে অবগত। কৃষ্ণের আনন্দ-বেদনা তাঁদের নিজের বলে মনে হয়।
নর্মসখারা কৃষ্ণের সঙ্গে নিত্য হাস্য-পরিহাস, রসাল আলাপ ও নানান নর্মকৌতুকে মেতে থাকেন। তাঁরা কৃষ্ণকে হাসাতে, আনন্দ দিতে এবং পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের উপস্থিতিতে কৃষ্ণের লীলা হয়ে ওঠে আরও রসপূর্ণ, আরও উজ্জ্বল।
এই চার শ্রেণীর গোপালরা মিলে শ্রীকৃষ্ণের ব্রজ-লীলা জগৎকে করে তুলেছেন অপরূপ, প্রাণবন্ত ও চিরস্মরণীয়।
বৃন্দাবনের অসীম লীলামাধুর্যের মধ্যে অন্যতম হলো শ্রীকৃষ্ণের সখাদের সঙ্গে তাঁর সখ্য-সম্পর্ক। এই সখাগণ চার শ্রেণীতে বিভক্ত—সুহৃত, সখা, প্রিয়সখা, নর্মসখা। এর মধ্যে প্রিয়সখা হলেন সেই সব সখা যারা কৃষ্ণের সঙ্গে বয়সে সমান এবং যাঁদের সম্পর্কের মূল ভিত্তি কেবল মাত্র খাঁটি রসপূর্ণ বন্ধুত্ব।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
“বরস্তুল্যাঃ প্রিয়সখাঃ সখ্যং কেবলমাশ্রিতাঃ।”
অর্থাৎ, যারা কৃষ্ণের সমবয়সী এবং কেবল সখ্য বা বন্ধুত্বের রসকে আশ্রয় করে আছেন—তাঁরাই প্রিয়সখা।
প্রিয়সখাদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্ক সম্পূর্ণ অচঞ্চল, নির্মল এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তারা কৃষ্ণের সঙ্গে খেলাধুলা করে, কৌতুক করে, মাঝে মাঝে রাগারাগিও করে—আবার মুহূর্তেই হেসে ওঠে। এই বন্ধুত্বের বন্ধন মোহ, ভয় বা লজ্জা ছাড়িয়ে, হৃদয়ের খোলামেলা ভালবাসায় ভরপুর।
তাঁরা কৃষ্ণের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের প্রতিটি মুহূর্তে সহচর।কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে তাঁদের খেলাধুলা, পথচলা, বনবিহার—সবই নিখাদ বন্ধুত্বের প্রকাশ।কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলার গাম্ভীর্য তাঁদের স্পর্শ করে না। এই সহজ-সরলতা সম্পর্কটিকে আরও প্রীতিময় করেছে।কৃষ্ণ যখন বাঁশি বাজান, তাঁরা প্রথমেই ছুটে যান তাঁর কাছে।বৃন্দাবনের বনে বনে তাঁদের হাসি-কোলাহলে লীলাভূমি মুখর হয়ে ওঠে।
প্রিয়সখা শ্রেণীর প্রধান সখাগণ হলেন—
স্তোককৃষ্ণ,কিঙ্কিণী,সুদাম,অংশু,ভদ্রসেন,বসুদাম,দাম,বিলাসী,বিটঙ্ক,কলবিঙ্ক,পুণ্ডরীক,সুদামাদি এবং শ্রীদাম (এই শ্রেণীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সখা)
এই সখাগণ বৃন্দাবনের সখ্যরসকে জীবন্ত করে তুলেছেন। কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত এক অনির্বচনীয় মাধুর্যে অলোকিত।
নিত্যানন্দ প্রভুর উপলব্ধি:
নিত্যানন্দ প্রভুর গভীর উপলব্ধি ছিল যে সংঘশক্তি ছাড়া কোনো মহৎ ধর্মীয় বা সামাজিক আন্দোলন সফল হতে পারে না। বাংলার মানুষের মধ্যে বৈষ্ণবধর্মের মহিমা ছড়িয়ে দিতে হলে প্রয়োজন ছিল একদল নিবেদিত, শাস্ত্রজ্ঞ, ও প্রেমভক্ত সহচরের। এই কারণেই তিনি তাঁর সমপ্রাণ, সমব্যথী ও নিত্যসঙ্গী ১২ জন পণ্ডিত ভক্তকে একত্র করে তাঁদের বিশেষভাবে “গোপাল” উপাধি প্রদান করেন।
এই দ্বাদশ ভক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দ্বাদশ গোপাল তত্ত্ব, যা বৈষ্ণবধর্মীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ধর্মপ্রচার, নামসংকীর্তন, অসহায়দের সেবা, এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব প্রদান করা হয় তাঁদের। তাঁদের দ্বারা পরিচালিত এই আধ্যাত্মিক আন্দোলন শুধু ধর্মীয় জাগরণই আনেনি, বরং বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিকে দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করেছিল।
নিত্যানন্দ প্রভুর এই সংগঠিত প্রয়াসের ফলেই বৈষ্ণবধর্ম বাংলার গৃহে গৃহে, জনপদে জনপদে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। দ্বাদশ গোপাল তাই শুধু ভক্ত নয়—
তাঁরা ছিলেন আন্দোলনের বাহক, প্রচারের অগ্রদূত এবং বৈষ্ণব ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
নিত্যানন্দ প্রভুর দ্বাদশ গোপাল নির্বাচন:
বাংলায় বৈষ্ণবধর্মের বিস্তারে নিত্যানন্দ প্রভু শুধু একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক ভাবনা, সামাজিক সমতা ও সংগঠিত শক্তির এক অগ্রগামী প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রচারকাজ ছিল যুগান্তকারী, কারণ এতে ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের গভীর বার্তাও নিহিত ছিল।
১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে পানিহাটি চিঁড়ে-দৈ মহোৎসব ছিল সেই সামাজিক বিপ্লবের সূচনা। জাতিভেদের কঠোর বেড়া ভাঙতে তিনি একসঙ্গে ৩৬ জাতিকে বসিয়ে ভোজন করিয়েছিলেন। বাংলায় জাতিভেদ বিলোপের এটি ছিল প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী গণঘোষণা—যেখানে খাদ্যের মাধ্যমে সমতার ধর্মীয় রীতি প্রতিষ্ঠা পায়। আজও বাংলার বহু স্থানে কীর্তন শেষে এক পংক্তিতে বসে মহোৎসবের খিচুড়ি ভোজন তারই ধারাবাহিক রীতি। তাই ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের উক্তি—
“নিত্যানন্দ বঙ্গের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রবাদী।”
—একেবারে যথার্থ।
বৃহৎ কাজ সম্পন্নের জন্য যে সংঘশক্তি প্রয়োজন, তা নিত্যানন্দ প্রভু গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এই কারণেই পানিহাটির গঙ্গাতীরে চিঁড়ে-দৈ মহোৎসবের সময়েই তিনি “দ্বাদশ গোপাল” নির্বাচন করে বাংলার বিভিন্ন জনপদে শ্রীপাট স্থাপনের দায়িত্ব প্রদান করেন। গোপাল শব্দের অর্থ—কৃষ্ণের রাখাল বন্ধু, অর্থাৎ বিশ্বস্ত, নিকটতম সঙ্গী।
শ্রী সুন্দরানন্দ ঠাকুর পূর্বজন্মে বারোজন গোপালের একজন ছিলেন, যার নাম ছিল সুধামা। সুন্দরানন্দ ঠাকুর ছিলেন ব্রজের সুদাম সখার অবতার। তিনি তেজস্বী ও দিব্যদেহধারী মহাপুরুষ হিসেবে সুপরিচিত। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন গভীরভাবে তীর্থানুরাগী এবং বিভিন্ন তীর্থে ভ্রমণ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিযুক্ত হতেন। তাঁর জন্মভূমি যশোহর জেলার হলদা মহেশপুর গ্রাম।
তিনি ছিলেন একজন নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, অর্থাৎ আজীবন অবিবাহিত।তৎকালীন যশোর জেলার মহেশপুর তিনি রাধা-বল্লভের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ব্রজলীলায় তিনি সুধামা নামে পরিচিত ছিলেন—বারোজন গোপালের একজন।
বর্তমানে মহেশপুরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ ও শ্রীশ্রীরাধারমণের সেবা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই পবিত্র স্থানটি আজও ভক্তসমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
“শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুর পানির ভিতরে কুন্ডীর ধরিয়া আনে সভায় গোচরে।”
তাঁর অলৌকিকতার আরেক অনন্য নিদর্শন হলো—জাম্বীর (লেবু) গাছে কদম্ব ফুল ফোটানো।
স্বাভাবিক নিয়মে যেখানে কদম্ব গাছে এই ফুল ফোটে, সেখানে লেবু গাছে কদম্ব ফুটানো কেবলই ঈশ্বরপ্রদত্ত শক্তি ও গভীর ভক্তিবলে সম্ভব। সুন্দরানন্দ ঠাকুর সেই বিরল সাধকদের অন্তর্গত, যাঁদের হৃদয়ের প্রেমানুভূতি প্রকৃতির নিয়মকেও বাঁকিয়ে দিতে সক্ষম।
এইসব অলৌকিক ঘটনাই প্রমাণ করে যে সুন্দরানন্দ ঠাকুর ছিলেন শুধু একজন ভক্ত নন, বরং নিত্যানন্দ প্রভুর অন্তরঙ্গ সঙ্গী, দিব্যশক্তি-সমৃদ্ধ আত্মা এবং পতিতপাবন নিত্যানন্দের করুণা-রূপের প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনকথা ভক্তদের মনে আজও বিস্ময়, শ্রদ্ধা ও গভীর বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে।
বনের প্রচণ্ড হিংস্র ব্যাঘ্রকেও তিনি নিজের আধ্যাত্মিক শক্তি ও দয়ার প্রভাবে বশমান করতে পারতেন। গভীর অরণ্য থেকে সেই বাঘ ধরে এনে তাঁর কানে সস্নেহে হরিনাম শোনাতেন। যে পশু স্বভাবতই ভয়ংকর ও অপ্রশমিত—তার হৃদয়েও তিনি ভক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হতেন। তাঁর এই অপূর্ব লীলার মধ্যেই প্রকাশ পায় তাঁর অসীম করুণা, অলৌকিক শক্তি এবং সকল জীবের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি।
তার আবির্ভাবকাল সম্পর্কে:
শ্রীসুন্দরানন্দ ঠাকুরের আবির্ভাবকাল সম্পর্কে শাস্ত্রীয় ও প্রাচীন বৈষ্ণব গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে তাঁর জন্ম ১৪০০ শত শকাব্দের কিছু পূর্বে। জন্ম থেকেই তিনি অতুলনীয় ভক্তিভাব ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন, যা পরবর্তীকালে তাঁকে নিত্যানন্দ প্রভুর অতি অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে প্রধান আসনে প্রতিষ্ঠা করে।তাঁর জীবনযাত্রা ও লীলার শেষ পর্যায়ের সময়কালও ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, তাঁর তিরোভাব হয় ১৪০০ শত শকাব্দের শেষ ভাগে—যখন বৈষ্ণবধর্মের প্রচার ও গৌড়ীয় আন্দোলনের উন্মেষ তুঙ্গে।পুরীধাম হইতে আগমন করে তিনি ১৪৩৯ শকে পানিহাটীর দণ্ডমহোৎসবে উপস্থিত ছিলেন। সেই মহোৎসবে তাঁর উপস্থিতি কীর্তন ও ভক্তসমাজে নতুন আনন্দের সঞ্চার করে। নিত্যানন্দ প্রভুর সান্নিধ্যে তিনি সেখানে বিশেষভাবে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।তবে ১৫০৪ শকাব্দে খেতুরীর মহোৎসব—যা ইতিহাসে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের অন্যতম প্রধান সম্মেলন—সেখানে তাঁকে দেখা যায় না। গবেষকদের মতে, এই সময়ের পূর্বেই তাঁর তিরোভাব ঘটেছিল বলে অনুমান করা হয়।
সুন্দরানন্দ ঠাকুরের জন্মস্থান ছিল তৎকালীন যশোহর জেলার মহেশপুর গ্রাম বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার মহেশপুর উপজেলা বণিকপাড়ায় অবস্থিত । গ্রামটি বেত্রাবতী নদীর তীরে অবস্থিত।
মহেশপুর গ্রামটি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের মাজিদিয়া স্টেশন থেকে প্রায় চৌদ্দ মাইল দূরে অবস্থিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই স্টেশনের নাম পূর্বে ছিল শিব’নবাস। পরবর্তীকালে এর নামকরণ হয় মাজিদিয়া।
তথ্যসূত্র: শ্রীশ্রীদ্বাদশ গোপাল বা শ্রীপাটের ইতিবৃৃত্ত (শ্রীঅমূল্যধন রায় ভট্ট)
“শ্রী চৈতন্য: হিজ লাইফ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস” — শ্রীল ভক্তিবল্লভ তীর্থ মহারাজ